Skip to main content

বিলুপ্তপ্রায় গ্রামীণ ঐহিত্য ঢেঁকি ।। জহির রহমান



বর্তমান যান্ত্রিক যুগ। আধুনিকতার যুগ। কর্মব্যস্ত মানুষের ব্যস্ততা যেমন বেড়েছে তেমনি যে কোন কাজ স্বল্প সময়ে স্বল্প শ্রমে দ্রুত সম্পন্ন করতে পারলেই মানুষ হাফ ছেড়ে বাঁচে। আধুনিক ও নতুন নতুন প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ অতীতের ঐতিহ্যবাহী অনেক অনেক জিনিসপত্রের ব্যবহার বা কর্মকান্ড যা তাদের জীবনাচারের সাথে ছিল অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত তা পরিত্যাগ করেছে কিংবা পরিত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে।

এজন্য কাউকে দোষারোপ করে লাভ নেই বরং যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে এবং সময় বাঁচাতে অতীতের অনেক কিছুই পরিত্যাগ করতে হয় এবং নিত্য নতুন অনেক কিছু সে জায়গা পুরণ করে নেয়ায় অতীত হয়ে যায় ইতিহাসের অংশ। কিন্তু আমাদের অতীত ঐতিহ্য ভুলে গেলে চলবেনা। জানা এবং পরবর্তী প্রজন্মকেও জানানো প্রয়োজন। অতীতকে জেনেই ভবিষ্যত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে সুফল লাভ হয় সহজ। আমাদের অতীত ইতিহাস ঐতিহ্য সমাজ সংস্কৃতি ইত্যাদি যাতে ভুলে না যাই সচেতন মহলের সেদিকে নজর দেয়া অবশ্যই প্রয়োজন। চিরায়ত বাংলার হারিয়ে যাওয়া সেই ইতিহাস ঐতিহ্যেরই একটি অংশ হচ্ছে আমাদের অতীতের বহুল ব্যবহৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় সমাজ সংস্কৃতির অংশ হল ঢেঁকি’র ব্যবহার।

আগেকার যুগে প্রায় প্রত্যেকটি বাড়িতেই ধান বানার জন্য ঢেঁকি থাকত। বর্তমানে নিতান্ত অজো পাড়াগাঁয়ের কোথাও কোথাও হয়ত ঢেঁকি থাকতেও পারে তবে, এসবের ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। ঢেঁকিছাটা চাউলের কদর এখনও কমেনি কারণ এ চাউলের ভাতের মজাই আলাদা। ঢেঁকিছাটা চাউলের উপরের আবরণ থাকে যাতে প্রচুর পরিমান ভিটামিন রয়েছে। ঢেঁকিছাটা চাউল পাওয়া যায় তবে এর দামও অন্যান্য চালের চেয়ে তুলনামুলকভাবে বেশি।

ঢেঁকি শিল্প গ্রাম বাংলার প্রাচীন গ্রামীন ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপুর্ণ অংশ। একসময় গ্রাম- গঞ্জসহ সর্বত্র ধান ভাঙ্গা, চাউল তৈরি, গুড়ি, চিড়া তৈরি, মশলাপাতি ভাঙ্গানো সহ বিভিন্ন কাজের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত চিরচেনা ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি। তখন এটা গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতির সাথে জড়িত ছিল ওতপ্রোতভাবে। অনেকে কুটির শিল্প তথা পেশা হিসেবেও ঢেঁকিতে ধান বানতেন। ঢেঁকি চালাতে সাধারণত দুজন লোকের প্রয়োজন হয়। সাধারণত মহিলারাই চালাতেন তাদের সাধের ঢেঁকি। এক প্রান্তে উঠে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে পা দিয়ে চাপ দিতে হয় আবার ছাড়তে হয়। অপরজন নির্দিষ্ট গর্তে যেখানে মলার আঘাতে চাউল থেকে ধান বের হয় সেখানে সতর্কতার সাথে ধান দিতে হয় আবার প্রতি আঘাতের পর পর ধান নড়াচড়া করে উল্টে পাল্টে দিতে হয় যাতে সবগুলোতে আঘাত লাগে। শেষ হলে বা গর্ত পরিপূর্ণ হয়ে গেলে এগুলো তুলে আবার নতুন ধান দিতে হয়। মহিলারা ধান বানার ফাঁকে ফাঁকে আঞ্চলিক গীত পরিবেশন করতেন মনের আনন্দে একক বা যৌথ কন্ঠে।

আমাদের দেশে সত্তরের দশকে সর্বপ্রথম রাইসমিল বা যান্ত্রিক ধান থেকে চাল বের করার কল বা মেশিন এর প্রচলন শুরু হয়। তখন থেকেই ঢেঁকির প্রয়োজনীয়তা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। একসময় সারাদেশে বার মাসে তের পার্বণ পালিত হত। গ্রামে গঞ্জে একটার পর একটা উৎসব লেগেই থাকত। হেমন্ত উৎসব, পৌষ পার্বণ, বসন্ত উৎসব, নববর্ষ, বিবাহ উৎসব, কনের বাড়ীতে আম কাঠঁল প্রদানের সময় হাতের তৈরী রুটি পিঠা তৈরির উৎসব, হিন্দুদের পূজা, মেলাসহ হরেক রকমের অনুষ্ঠানের আয়োজন হত বা এখনও হচ্ছে। এসব উৎসবে পিঠা পায়েস সন্দেস ইত্যাদি তৈরির ধুম পড়ে যেত। আর এসব তৈরীর মূল উপকরণ হচ্ছে চালের গুড়ি। চালের গুড়ি তৈরীর জন্য অতীতে ঢেঁকির আশ্রয় নেয়া হত। ঈদ বা উৎসবের সময় ঘনীভুত হয়ে এলে প্রত্যেক বাড়ীতেই ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ শুনেই আন্দাজ করা যেত ঈদ বা উৎসব এসেছে। গ্রাম বাংলার শৌখিন মহিলারা চালের গুড়ি দিয়ে চুই পিঠা, চিতল পিঠা, রুটি পিঠা, তালের পিঠা, সমছা সহ তৈরী করতেন হরেক রকমের পিঠা। কিন্তু বর্তমান আধুনিক এ যান্ত্রিক যুগে বিভিন্ন অনুষ্ঠান উৎসবে আর অতীতের মতো জৌলুস নেই। উৎসবগুলো আজকাল প্রথা বা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটা সময় ছিল বড় গৃহস্থ বা কৃষকের ঘরে অবসর সময়ে বা রাতের অধিকাংশ সময়ই ঢেঁকিতে ধান বানার কাজ করতে হতো। ধান বানতে বানতে অনেক মহিলার হাতে ফসকা পড়ে যেত। গরিব মহিলারা বা গৃহ পরিচারিকারা এক আধসের চাল বা ধান পারিশ্রমিকের মাধ্যমে কেহবা শুধু পেটপুরে খাবার বিনিময়ে ধনিদের ঘরে চাল ভাঙার কাজে নিয়োজিত থাকতো। যে গৃহস্থ যতো বেশি ধান বা চাউল উৎপাদন করে বিক্রয় করতে পারতেন তিনিই এলাকায় ততো বড়ো ধনী হিসেবেই খ্যাতি অর্জন করতেন। তাই বড়ো বড়ো গৃহস্থের বাড়ীতে ঢেঁকিতে ধান বানার আওয়াজ তথা ঢেকুর ঢেকুর শব্দ শুনা যেত হরদম।

কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ। এখন শুধু চাল নয় মশলাপাতিও মেশিনের মাধ্যমে ভাঙ্গানো হয়। পাটা পুতাইলের ঘষায় যে মরিছ পিষা হতো তাও এখন বিলুপ্ত প্রায়। মহিলাদের আরামের পরিধি বেড়েছে। বেড়েছে আধুনিকতা ও আধুনিক যান্ত্রিক জীবন যাপন। গ্রামের দু-এক বাড়ীতে ঁেঢকির অস্তিত্ব থাকলেও এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো যাদুঘরে গিয়ে জানতে হবে ঢেঁকি কী জিনিস এবং এর মাধ্যমে কোন ধরনের কাজ করা হতো।

Comments

Popular posts from this blog

‘প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নৈতিক ক্ষমতা আছে’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, একতরফা কোন নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিগত ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় একতরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো নজির নেই। ৮৬ সালের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছিল তাও গ্রহণযোগ্যতা পেত না। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। গতকাল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা নাগরিক হিসাবে উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগের যায়গা থেকেই প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়েছি। আমরা প্রেসিডেন্টের কাছে একই সুরে কথা বলেছি। আমাদের মূল আহ্বান ছিল একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়ে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা আমরা স্পষ্ট করেছি। সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ও সহিংস কর্মসূচিগুলো অবস্থার অবনতি ঘটছে তাও আমরা তুলে ধরেছি। আমরা মনে করি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু সমাধানের আগেই নির্বাচনে সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। এটা আমাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আপনাদেরকে প্রেসিডেন্ট কি আশার বাণী ...

বিএনপিকে নির্মূল করতে মরিয়া সরকার: ফখরুল

বিএনপিকে নির্মূল করতে সরকার মরিয়া বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে ফখরুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মামলায় ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ও জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ গতকাল আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, জনবিচ্ছিন্ন আওয়ামী সরকার বিএনপিসহ দেশের বিরোধী দলগুলোকে নির্মূল করে একদলীয় দু:শাসনকে দীর্ঘায়িত করতেই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ উদ্ভট, মনগড়া ও ভিত্তিহীন মামলা দায়েরের মাধ্যমে তাদেরকে কারাগারে পুরে রাখছে। মূলত: শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপিকে নির্মূল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল  কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বলেই গতকাল তার জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মির্জা ফখরুল অবিলম্বে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ এর বিরু...

অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিন- রাজনীতির নামে নৃশংসতা

যাত্রীসমেত বাসে পেট্রলবোমা মেরে ১৯ জন মানুষকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা যে রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না, এটা কে না জানে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা যেন এ রকমই! এ দেশের মানুষের জীবনযাপন আজ এভাবেই জিম্মি হয়ে পড়েছে নৃশংস রাজনৈতিক কৌশলের হাতে। ১৮-দলীয় জোটের তিন দিনের অবরোধের শেষ দিন গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনাটির নিন্দা এবং ধিক্কার জানানোর ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। নিরীহ ১৯ জন মানুষ, যাঁদের দুজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন, আরও কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। তাঁদের এবং তাঁদের স্বজনদের প্রতি জানাই সান্ত্বনা ও সমবেদনা। পেট্রলবোমার শিকার হওয়া বাসটি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি মডেল। সেটিতে বাসচালক ও তাঁর সহযোগী ছাড়াও ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ—ছাত্র, ব্যাংকের কর্মকর্তা, পুলিশের কনস্টেবল, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। তাঁরা কাজ শেষে ঘরে ফিরছিলেন। কী অপরাধ ছিল তাঁদের? কেন এই নৃশংসতার শিকার তাঁদের হতে হলো? এমন নৃশংসতার ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে সারা দেশের মানুষ। বিরোধী দলের তিন দিনের অবরোধে না...