Skip to main content

যে কারণে নির্বাচনে অনড় সরকার

বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা না হলেও নির্বাচনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই ইতিমধ্যে ২৯ সদস্যের নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হয়েছে।
নির্বাচনী প্রস্তুতিতে কমতি নেই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের। নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি, মনোনয়নপত্র বিক্রি, দলীয় প্রার্থী বাছাই, দলীয় সভানেত্রীর নির্বাচনী সফর্- সবকিছুই চলছে পুরোদস্তুর।

হরতাল-অবরোধসহ বিরোধী দলের কঠোর আন্দোলন, আন্তর্জাতিক চাপ ও সুশীল সমাজের সমালোচনার পরও নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনড় আওয়ামী লগের নেতৃত্বাধীন সরকার। তাদের এই অনড় অবস্থান নিয়ে কৌতূহল রয়েছে দেশের নানা মহলে। ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারণী মহলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ও দলীয় সূত্রে এর পেছনের কয়েকটি কারণের কথা জানা গেছে। নানা চাপ থাকা সত্ত্বেও মূলত এই কারণগুলোর জন্যই নিজেদের অবস্থান থেকে আপাতত সরছে না সরকার বা সরকারি দল।

রোলমডেল হতে চান প্রধানমন্ত্রী
নির্বাচিত সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের পর শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে রোলমডেল হতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বেশ কবার বলেছেন, “দেশে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের রীতি এখনো গড়ে ওঠেনি। আমাদের একবার না একবার এই রীতি শুরু করতে হবে। আর এর যাত্রা আওয়ামী লীগের হাত দিয়েই শুরু হোক।”

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম নতুন বার্তা ডটকমকে বলেন, “আওয়ামী লীগ ইতিহাস সৃষ্টি করে। আওয়ামী লীগের হাত দিয়েই দেশে স্বধীনতা এসেছে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। জয়-পরাজয় বড় কথা নয়। অবাধ সুষ্ঠ নির্বাচন উপহার দিয়ে নজির সৃষ্টি করতে চায় আওয়ামী লীগ।”

তৃতীয় পক্ষকে সুযোগ না দেয়া
এই মুহূর্তে দেশে কোনো অনির্বাচিত শক্তিকে ক্ষমতায় দেখতে চাইছে না আওয়ামী লীগ। দলটির নীতিনির্ধারণী মহল মনে করছে, তত্ত্বাবধায়কের নামে অনির্বাচিত কোনো সরকার এলে দেশে আবার এক-এগারোর মতো সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে। সেই সরকার আবারও রাজনীতি থেকে রাজনীতিবিদদের মাইনাস করা ও জেল-জুলুমের কারণ হতে পারে।

রাজনীতিবিদদের নিয়ে কাউকে কোনো ধরনের খেলার সুযোগ দিতে চাইছে না ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও। তাই নির্বাচনের বিকল্প ভাবছে না দলটি। দলের সভাপতি শেখ হাসিনাও বলেছেন, তিনি কেবল আরেকটি নির্বাচিত সরকারের হাতেই ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। অনির্বাচিত করো কাছে ক্ষমতা দেবেন না।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী ইশেতেহার। এ কাজে সরকারকে অনেকটা সফল বলেও স্বীকার করে অনেকে। নির্বাচনে এই ইস্যু কাজে লাগাতে চায় তারা।

দলটির নীতিনির্ধারণী একটি মহল মনে করেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন ও তাদের রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হলে আওয়ামী লীগকেই আবার ক্ষমতায় আসতে হবে। তা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী যেসব শক্তি এই ইস্যুতে এখনো সরকারের পক্ষে রয়েছে, তারাও চাইছে সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে অসম্পন্ন কাজগুলো সম্পন্ন হোক।

বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের মনোবল ভাঙা
নির্বাচনী দৌড়ে এগিয়ে থাকার কৌশল হিসেবেও সরকারি দলের বর্তমান কঠোর অবস্থানের অন্যতম কারণ। আর তাই নানাভাবে বিএনপিসহ আন্দোলনকারী দলগুলোর নেতা-কর্মীদের মনোবল ভাঙতে চাইছে সরকার। দলের সিনিয়র নেতাদের গ্রেফতার করে বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতাদের মনোবল ভেঙে দেয়ার কৌশল নিয়েছে সরকার। ইতিমধ্যে বিএনপির সিনিয়র কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সরকারবিরোধী আন্দোলনের মাত্রা বাড়লে গ্রেফতারের সংখ্যাও বাড়বে। এমনই সিদ্ধান্ত সরকারের।

সরকারসংশ্লিষ্ট মহল জানায়, এ কঠোর অবস্থান আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে সরকার, যাতে নির্বাচন ঠেকাতে বড় কোনো আন্দোলন নিয়ে মাঠে নামতে না পারে বিরোধী দল।

নিজ দলের নেতাকর্মীদের চাঙা রাখা
সরকারের এ অবস্থানকে সমর্থন করে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও। বিরোধী দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিতে প্রথমেই বড় নেতাদের ধরপাকড় শুরু করেছে সরকার। সরকার ও সরকারি দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, হঠাৎ করে গ্রেপ্তার অভিযান শুরু হলেও এটি পূর্বপরিকল্পিত। দল ও সরকারের যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই এ অভিযান চালানো হচ্ছে।

কয়েকজন মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্বশীল নেতা জানান, পরিবেশ-পরিস্থিতি বুঝে সরকারের কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতারাও মাঠে থাকবে সার্বক্ষণিক।

বিএনপির নেতাদের নির্বাচনে আসার সম্ভাবনা
নির্বাচনে দল অংশ না নিলেও বিএনপির কিছু নেতা অংশ নিতে পারেন- এমনটাই মনে করছে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল। তারা বলছে, বিএনপির  নেতাকর্মীরা নির্বাচনের জন্যে মুখিয়ে আছেন। বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ না নিলেও দলটির অনেক নেতা অন্য কোনো দলের ব্যানারে নির্বাচনে আসবেন।

জাতীয় সংসদের বিগত অধিবেশনে ‘রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-২০১৩’ পাস হয়েছে। বিলের একটি ধারা বিলুপ্ত করার মাধ্যমে সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হওয়ার জন্য ন্যূনতম তিন বছর ওই দলের সদস্য থাকার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে যে কেউ কোনো দলে যোগ দিয়েই সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন।

আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড মনে করছে, বিএনপির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতা নির্বাচনে এলে, তখন আর নির্বাচনকে একতরফা বলা যাবে না। বিভিন্ন আসনে বিএনপির নেতারা অন্য দল বা স্বতন্ত্র নির্বাচন করলে ভোটের হারও বাড়বে বলে ধারণা করছেন তারা।
তবে সরকারের এ নির্বাচনী পথচলা মসৃণ হবে না মোটেই। একদিকে বিরোধী দলের কঠোর আন্দোলনের আশঙ্কা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপ। এর সঙ্গে রয়েছে দেশের সুশীল সমাজের সমালোচনা। আর দেশের জনগণও চায় সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক।

বিদেশী চাপের বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন নতুন বার্তা ডটকমকে বলেন, “আমরা বিদেশী কোনো শক্তির চাপে নেই। তাদের কথা কেন শুনতে হবে। আমাদের দেশের সমস্যা আমরাই সমাধান করব।

Comments

Popular posts from this blog

‘প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নৈতিক ক্ষমতা আছে’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, একতরফা কোন নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিগত ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় একতরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো নজির নেই। ৮৬ সালের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছিল তাও গ্রহণযোগ্যতা পেত না। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। গতকাল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা নাগরিক হিসাবে উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগের যায়গা থেকেই প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়েছি। আমরা প্রেসিডেন্টের কাছে একই সুরে কথা বলেছি। আমাদের মূল আহ্বান ছিল একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়ে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা আমরা স্পষ্ট করেছি। সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ও সহিংস কর্মসূচিগুলো অবস্থার অবনতি ঘটছে তাও আমরা তুলে ধরেছি। আমরা মনে করি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু সমাধানের আগেই নির্বাচনে সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। এটা আমাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আপনাদেরকে প্রেসিডেন্ট কি আশার বাণী ...

বিএনপিকে নির্মূল করতে মরিয়া সরকার: ফখরুল

বিএনপিকে নির্মূল করতে সরকার মরিয়া বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে ফখরুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মামলায় ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ও জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ গতকাল আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, জনবিচ্ছিন্ন আওয়ামী সরকার বিএনপিসহ দেশের বিরোধী দলগুলোকে নির্মূল করে একদলীয় দু:শাসনকে দীর্ঘায়িত করতেই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ উদ্ভট, মনগড়া ও ভিত্তিহীন মামলা দায়েরের মাধ্যমে তাদেরকে কারাগারে পুরে রাখছে। মূলত: শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপিকে নির্মূল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল  কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বলেই গতকাল তার জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মির্জা ফখরুল অবিলম্বে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ এর বিরু...

অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিন- রাজনীতির নামে নৃশংসতা

যাত্রীসমেত বাসে পেট্রলবোমা মেরে ১৯ জন মানুষকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা যে রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না, এটা কে না জানে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা যেন এ রকমই! এ দেশের মানুষের জীবনযাপন আজ এভাবেই জিম্মি হয়ে পড়েছে নৃশংস রাজনৈতিক কৌশলের হাতে। ১৮-দলীয় জোটের তিন দিনের অবরোধের শেষ দিন গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনাটির নিন্দা এবং ধিক্কার জানানোর ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। নিরীহ ১৯ জন মানুষ, যাঁদের দুজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন, আরও কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। তাঁদের এবং তাঁদের স্বজনদের প্রতি জানাই সান্ত্বনা ও সমবেদনা। পেট্রলবোমার শিকার হওয়া বাসটি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি মডেল। সেটিতে বাসচালক ও তাঁর সহযোগী ছাড়াও ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ—ছাত্র, ব্যাংকের কর্মকর্তা, পুলিশের কনস্টেবল, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। তাঁরা কাজ শেষে ঘরে ফিরছিলেন। কী অপরাধ ছিল তাঁদের? কেন এই নৃশংসতার শিকার তাঁদের হতে হলো? এমন নৃশংসতার ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে সারা দেশের মানুষ। বিরোধী দলের তিন দিনের অবরোধে না...