Skip to main content

দক্ষিণ আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া নেলসন ম্যান্ডেলার ভাষণ ‘স্বাধীনতাই হবে আমাদের শাসক’

ইউনিয়ন বিল্ডিংস, প্রিটোরিয়া, ১০ মে ১৯৯৪
আজ এখানে আমাদের উপস্থিতির মাধ্যমে এবং দেশজুড়ে ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে উদ্যাপনের দ্বারা আমাদের নবীন স্বাধীনতার প্রতি গৌরব ও প্রত্যাশা ন্যস্ত করছি।
সুদীর্ঘকাল স্থায়ী নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা থেকে অবশ্যই এমন একটি সমাজ জন্মলাভ করবে, যা সমগ্র মানবতাকেই গৌরবান্বিত করবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের প্রতিদিনের কর্ম থেকেই উদ্ভূত হবে দক্ষিণ আফ্রিকার সেই বাস্তবতা, যা সুবিচারের প্রতি মানবিক বিশ্বাসকে দৃঢ়তর করবে, মানবাত্মার মহত্ত্ব-সম্পর্কিত আস্থাকে শক্তিশালী করবে এবং সবার গৌরবময় জীবনের জন্য আমাদের সব প্রত্যাশাকে স্থায়িত্ব দেবে। এ সবকিছুই আমরা চাই আমাদের নিজেদের জন্য এবং সমগ্র বিশ্বের জনগণের জন্যও, এখানেও তাঁদের ব্যাপক প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।
আমার সহযোদ্ধাদের প্রতি এ কথা বলতে আমার কোনো দ্বিধা নেই যে, আমাদের প্রত্যেকেই এই শোভাময় দেশটির মাটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত হয়ে আছি, যেমনটি রয়েছে প্রিটোরিয়ার বিখ্যাত ‘জাকারান্ডা’ এবং বুশভেল্ডের (ট্রান্সভালের নিচু অঞ্চল) ‘মাইমোসা’ বৃক্ষগুলো। যখনই আমরা কেউ দেশের মাটি স্পর্শ করি, তখনই ব্যক্তিগতভাবে নবীকরণের উপলব্ধি সঞ্চারিত হয়। মৌসুম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আবেগ-অনুভূতিরও পরিবর্তন ঘটে। ঘাসগুলো যখন সবুজ হয়ে ওঠে, যখন ফুল ফোটে, তখন আমরাও আনন্দ অনুভব করি এবং উজ্জীবিত হই।
আমরা সবাই দেশমাতৃকার সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক যে অবিচ্ছিন্নতা উপলব্ধি করি, তার মধ্যেই ব্যাখ্যা মেলে, কী দারুণ বেদনা আমাদের সহ্য করতে হয়েছে, যখন আমাদের দেশটি সংঘাতে সংঘাতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল, যখন বিশ্বের সবাই আমাদের দেশটিকে বর্জন করছিল, অপরাধী গণ্য করে নিঃসঙ্গতায় ঠেলে দিচ্ছিল। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এর কারণ ছিল, আমাদের এই দেশটিকে ধ্বংসাত্মক নীতি-কৌশল এবং সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ আর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ভিত্তি বানিয়ে ফেলা হয়েছিল।
আমরা দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণ আবার হূদয়ভরে ভাবতে পারছি, বিশ্বমানবতা আমাদের আবার বুকে টেনে নিয়েছে। বেশি দিন হয়নি, আমাদের অপরাধী বলে বিবেচনা করা হতো, আমরাই আজ দেশের মাটিতে বিশ্বের জাতিসমূহের আতিথেয়তা করার বিরল সুযোগ পেয়েছি। আমাদের মান্যবর আন্তর্জাতিক অতিথিদের ধন্যবাদ জানাই। কারণ, তাঁরা এখানে আমাদের জনগণের সঙ্গে সমবেত হয়ে সুবিচার, শান্তি আর মানবিক মর্যাদার অনন্যসাধারণ বিজয়ের অংশভাগী হয়েছেন। আমরা অবশ্যই প্রত্যাশা করব যে, যখন আমরা শান্তি, সমৃদ্ধি, লিঙ্গবৈষম্যহীনতা, জাতিগত বৈষম্যহীনতা এবং গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করব, তখনো আপনারা আমাদের পক্ষেই থাকবেন।
গভীর প্রশংসার সঙ্গে আমি উল্লেখ করতে চাই যে, বর্তমান অবস্থানে পৌঁছার জন্য আমাদের জনগণ, তাদের রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক, ধর্মীয় সংগঠন, নারী এবং যুবসমাজ, ব্যবসায়ীসহ প্রথাগত এবং অন্য সংগঠনসমূহ যথার্থই বিপুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এ ক্ষেত্রে আমার অনুবর্তী ব্যক্তি, সম্মানিত ডেপুটি প্রেসিডেন্ট এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্কের ভূমিকাও সমগুরুত্বের সঙ্গেই উল্লেখযোগ্য।
শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে চাই আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বস্তরের সদস্যদের প্রতি। তাঁরা সবাই প্রভূত সহায়তা প্রদান করেছেন আমাদের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিরাপদে অনুষ্ঠানের কাজে। অন্ধকারের রক্তপিপাসু, যারা এখনো আলোতে আসতে রাজি নয়, তাদের কাছ থেকে গণতান্ত্রিক শক্তির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কাজেও সেনাসদস্যরা বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।
এখন সব ক্ষত নিরাময়ের সময় সমাগত। এত দিন গোষ্ঠী-সংঘাতের যে গভীর খাদ আমাদের বিচ্ছিন্ন-বিভক্ত করে রেখেছিল, তাতে সেতু-সংযোগের সময় এসেছে। গঠনমূলক কাজের সময়টা এখন আমাদেরই হাতে। শেষ পর্যন্ত আমরা রাজনৈতিক বন্ধনমুক্ত হতে পেরেছি। আমরা এখন আমাদের জনগণের প্রতি দারিদ্র্য, বঞ্চনা, দুর্দশা এবং লৈঙ্গিক ও অন্যবিধ বৈষম্য মুক্তির অঙ্গীকার করছি।
স্বাধীনতার লক্ষ্যে শেষ পদক্ষেপটি আমরা তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই নিতে পেরেছি। এখন আমরা পরিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজেদের উৎসর্গ করছি। আমাদের লাখো কোটি মানুষের অন্তরে আশা জাগাতে আমরা বিজয় লাভ করেছি। এখন আমরা নতুন অঙ্গীকার করছি, আমরা এমন এক সমাজ গড়ে তুলব, যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার সব মানুষ, কালো-সাদানির্বিশেষে সবাই ভয়হীন হূদয়ে মাথা উঁচু করে চলতে পারবে। সবাইকে অসমর্পণীয় মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। আমাদের বহু বর্ণ-জাতি নিজেদের মধ্যে এবং বিশ্বের সবার সঙ্গে শান্তিতে থাকবে।
নতুন করে জাতি গঠনের লক্ষ্যে আমাদের উদ্যোগের নিদর্শন হিসেবে বর্তমান জাতীয় ঐক্যের অন্তর্বর্তী সরকার, জরুরি পদক্ষেপ বিবেচনা করেই বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগরত আমাদের জাতির সবাইকে মুক্তি প্রদান করা হবে। অতঃপর তাঁদের সবার জন্যই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ব্যবস্থা করা হবে।
আমাদের দেশে এবং বিশ্বের যেখানে যত বীর এবং বীরাঙ্গনারা আমাদের মুক্তির অনুকূলে জীবন দিয়েছেন, কিংবা অন্যবিধ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁদের সবার উদ্দেশে আজকের এই আনন্দময় দিনটিকে আমরা উৎসর্গ করছি। তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ লাভ করেছে, স্বাধীনতাই তাঁদের পুরস্কার।
আপনারা দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণ, একটি ঐক্যবদ্ধ, গণতান্ত্রিক, বর্ণবৈষম্যহীন, লৈঙ্গিক বৈষম্যমুক্ত জাতি গঠনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমাদের ওপর যে মহান দায়িত্ব ন্যস্ত করেছেন, তার জন্য সম্যকরূপেই বিনম্র এবং সম্মানিত বোধ করছি। আমরা এখনো উপলব্ধি করি যে স্বাধীনতার কোনো সহজ পথ নেই। বিশেষভাবেই আমরা জানি যে, আমাদের কারও পক্ষেই একাকী কোনো সাফল্য লাভ করা সম্ভব নয়। ঐক্যবদ্ধ জনগণ হিসেবে কাজ করেই আমরা জাতীয় পুনর্মিলন ও পুনর্গঠন এবং একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা করতে পারব।
সবার জন্য সুবিচার নিশ্চিত হোক। সবার জন্য শান্তি নিশ্চিত হোক। সবাইকেই কাজ, খাদ্য, পানি ও লবণের নিশ্চয়তা দিতে হবে। সবাই জানবেন, প্রত্যেকের পূর্ণ বিকাশের জন্য আপনাদের সবারই দেহ-মন-আত্মার মুক্তির নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে। কখনো নয়, আর কখনো নয়, এই সুন্দর দেশের কোনো মানুষ আর কখনো অন্য কারও দ্বারা নির্যাতিত হবে না, বিশ্বের নোংরা মানুষ বলে কারও দ্বারাই অপমানিত হবে না। স্বাধীনতাই হবে আমাদের শাসক। এমন গৌরবময় মানবিক অর্জন কখনো সূর্যাস্তের আঁধারে হারাতে পারে না।

ঈশ্বর আফ্রিকার মঙ্গল করুন।
ভাষান্তর: রামেন্দ্র চৌধুরী।
সূত্র: নেলসন ম্যান্ডেলা ইন হিজ ওন ওয়ার্ডস।

Comments

Popular posts from this blog

‘প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নৈতিক ক্ষমতা আছে’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, একতরফা কোন নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিগত ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় একতরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো নজির নেই। ৮৬ সালের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছিল তাও গ্রহণযোগ্যতা পেত না। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। গতকাল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা নাগরিক হিসাবে উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগের যায়গা থেকেই প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়েছি। আমরা প্রেসিডেন্টের কাছে একই সুরে কথা বলেছি। আমাদের মূল আহ্বান ছিল একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়ে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা আমরা স্পষ্ট করেছি। সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ও সহিংস কর্মসূচিগুলো অবস্থার অবনতি ঘটছে তাও আমরা তুলে ধরেছি। আমরা মনে করি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু সমাধানের আগেই নির্বাচনে সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। এটা আমাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আপনাদেরকে প্রেসিডেন্ট কি আশার বাণী ...

বিএনপিকে নির্মূল করতে মরিয়া সরকার: ফখরুল

বিএনপিকে নির্মূল করতে সরকার মরিয়া বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে ফখরুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মামলায় ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ও জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ গতকাল আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, জনবিচ্ছিন্ন আওয়ামী সরকার বিএনপিসহ দেশের বিরোধী দলগুলোকে নির্মূল করে একদলীয় দু:শাসনকে দীর্ঘায়িত করতেই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ উদ্ভট, মনগড়া ও ভিত্তিহীন মামলা দায়েরের মাধ্যমে তাদেরকে কারাগারে পুরে রাখছে। মূলত: শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপিকে নির্মূল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল  কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বলেই গতকাল তার জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মির্জা ফখরুল অবিলম্বে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ এর বিরু...

অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিন- রাজনীতির নামে নৃশংসতা

যাত্রীসমেত বাসে পেট্রলবোমা মেরে ১৯ জন মানুষকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা যে রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না, এটা কে না জানে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা যেন এ রকমই! এ দেশের মানুষের জীবনযাপন আজ এভাবেই জিম্মি হয়ে পড়েছে নৃশংস রাজনৈতিক কৌশলের হাতে। ১৮-দলীয় জোটের তিন দিনের অবরোধের শেষ দিন গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনাটির নিন্দা এবং ধিক্কার জানানোর ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। নিরীহ ১৯ জন মানুষ, যাঁদের দুজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন, আরও কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। তাঁদের এবং তাঁদের স্বজনদের প্রতি জানাই সান্ত্বনা ও সমবেদনা। পেট্রলবোমার শিকার হওয়া বাসটি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি মডেল। সেটিতে বাসচালক ও তাঁর সহযোগী ছাড়াও ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ—ছাত্র, ব্যাংকের কর্মকর্তা, পুলিশের কনস্টেবল, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। তাঁরা কাজ শেষে ঘরে ফিরছিলেন। কী অপরাধ ছিল তাঁদের? কেন এই নৃশংসতার শিকার তাঁদের হতে হলো? এমন নৃশংসতার ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে সারা দেশের মানুষ। বিরোধী দলের তিন দিনের অবরোধে না...