Skip to main content

যেন ভুলে না যাই by সাযযাদ কাদির

পুরনো বছরকে বিদায়, আর নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর এই সময়টায় এক-দু’বার তাকাই পিছন ফিরে। দেখি, কি ফেলে এলাম, আর যাচ্ছি কোন দিকে।
তবে বেশি করে মনে পড়ে হারিয়ে যাওয়া স্বজন-প্রিয়জনের মুখ। ২০১৩ সালে হারিয়েছি তাঁদের অনেককে। বছরের প্রথম দিকে, ১৫ই জানুয়ারি, চলে গেছেন প্রিয় কথাশিল্পী আবদুশ শাকুর। ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। সংগীত থেকে গোলাপ, আরও অনেক বিষয়ে ছিলেন বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব। ১৯৬১ সালে মুগ্ধ হয়েছিলাম তাঁর যতিচিহ্নহীন গল্পগ্রন্থ ‘ক্ষীয়মাণ’ পড়ে। পরিচয় ১৯৭৬ সালে ‘বিচিত্রা’য়। সেই থেকে বিভিন্ন পত্রিকায় সম্পাদনা-সূত্রে তাঁকে পেয়েছি ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, কলামনিস্ট হিসেবে। তাঁর কারণেই একবার ‘ঈদ-উত্তর বিশেষ সংখ্যা’ ছাপতে হয়েছিল ‘বিচিত্রা’র। পরে তা একটি ধারাই সৃষ্টি করে প্রকাশনায়। রংপুরে বিভিন্ন সাহিত্য-উৎসবে গিয়ে পরিচিত হয়েছিলাম শতবর্ষী কবি নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ-এর সঙ্গে। পরিচিত ছিলেন স্বভাবকবি হিসেবে। জন্ম রংপুর শহরের অদূরে বাবুখাঁ গ্রামে। ২০শে জানুয়ারি চলে গেছেন তিনি। আমার বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু চলচ্চিত্র-ব্যক্তিত্ব আকন্দ সানোয়ার মুর্শেদ-কে হারিয়েছি ১৯শে ফেব্রুয়ারি। ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের সদস্য থাকাকালে ওঁর ছবি ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ বিনা কর্তনে মুক্তির ব্যাপারে যথাযথ যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনে বিশেষ ভূমিকা ছিল আমার। এর দু’দিন আগে, ১৭ই ফেব্রুয়ারি, আমাদের ছেড়ে যান আরও একজন চলচ্চিত্রকার ইকরাম বিজু। পরিচয় হয়েছিল অভিনেত্রী নাসিমা খানের ভাই হিসেবে, পরে বন্ধু হয়ে যান কৃতী নির্মাতা হিসেবে। মনে পড়ছে হিন্দি ‘ঘর’ (রেখা-বিনোদ মেহরা) অবলম্বনে নির্মিত তাঁর ছবি নিয়ে ঝামেলায় পড়ার ঘটনাটি। অনুজপ্রতিম রাজনীতিক শামীম আল মামুনকে হারিয়েছি ২৫শে ফেব্রুয়ারি। স্বাধীনতার পর টাঙ্গাইল পৌরসভার নির্বাচনে বিরোধী দলীয় প্রার্থী হিসেবে তলোয়ার মার্কা নিয়ে বিজয়ী হয়েছিল চেয়ারম্যান পদে। তরুণ বয়সে ওর ওই সাফল্য ছিল চমক-লাগানো। বড় ভাই কবি আল মুজাহিদী’র ফেলে আসা রাজনৈতিক জীবনকে ও গড়ে নিয়েছিল নিজের মতো করে। আমার প্রিয় অঙ্কনশিল্পী ‘কাব্যিক পরাবাস্তববাদী’ গণেশ পাইন চলে গেছেন ১২ই মার্চ। বাংলার লোকরচনা ভিত্তিক তাঁর জাদুশিল্প নিশ্চয়ই অমর করে রাখবে তাঁকে। লোকশিল্পী আরও একজনকে হারিয়েছি ৩১শে মার্চ। তিনি গায়ক সনৎ সিংহ। তাঁর ছড়া ও রঙ্গকৌতুক গান কি ভোলা যাবে কখনও? সেই ‘বাবুরাম সাপুড়ে কোথা যাস্‌ বাপু রে’, ‘এক এক্কে এক’ কিংবা ‘ঠিক দুক্কুর বেলা ভূতে মারে ঢিল’ এ সবের জবাব মিলবে না কোনও দিন। আমাদের লোকশিল্পী আবদুর রহমান বয়াতীকে হারিয়েছি ১৯শে আগস্ট। ‘মানুষ বানাইয়া খেলছো তারে লইয়া’, ‘দেহঘড়ি’, ‘পাগল মন’ আরও কত অবিস্মরণীয় গান এই শিল্পীর। এ সৃষ্টি হারাবে না কোনও দিনই। হিন্দি ফিল্মি গানের নন্দিত শিল্পী শামশাদ বেগম বিদায় জানিয়েছেন ২৩শে এপ্রিল। এস ডি বর্মণের সুরে ‘বাহার’ (১৯৫১) ছবির গানগুলো দিয়েই তিনি হৃদয়মন কেড়ে নিয়েছিলেন আমার, ফেরত দেন নি আর। ‘দুনিয়া কি মজা লে লো’, ‘সাইয়াঁ দিল মেঁ আনা রে’ ও আরও অনেক গান এখনও মুখর করে তোলে স্মৃতিকে। ওই ‘বাহার’ ছবির ভিলেন প্রাণ-ও বিদায় নিয়েছেন ১২ই জুলাই। নিন্দিত চরিত্রে অভিনয় করেও যে নন্দিত হওয়া যায় তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ তিনি। চলচ্চিত্র-জগতের আরেক প্রিয় স্রষ্টা ঋতুপর্ণ ঘোষকে হারিয়েছি ৩০শে মে। বলতে গেলে কলকাতা’র বাংলা ছবিকে মুক্তি দিয়ে গিয়েছেন তিনি। তাঁর ‘তিতলী’কে ভাল লাগার কথা মনে থাকে সব সময়। কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন চলে গেছেন ১৬ই জুন। বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনে পরিচিত, জুনিয়র ছিলেন, সে হিসেবে সম্মান সম্ভ্রম প্রকাশ করেছেন সব সময়েই। অ্যালেন গিনসবার্গ-এর কবিতা অনুবাদের জন্য আমাকেই বেছে নেয়াতে প্রমাণ মেলে তাঁর সেই সশ্রদ্ধ মনোভাবের। দুঃখ, সেই অনুবাদ আর করা হলো না আমার। অভিনেতা আনোয়ার হোসেন শেষ অভিবাদন জানিয়েছেন ১৩ই সেপ্টেম্বর। নবাব সিরাজউদ্দৌলা, জীবন থেকে নেয়া, অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী, পালঙ্ক- কত প্রিয় ছবিতে তাঁকে পেয়েছি প্রিয়তর রূপে। মানুষ হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, সজ্জন। ‘বিচিত্রা’য় তাঁকে নিয়ে আমার প্রচ্ছদ-রচনার শিরোনাম ছিল ‘মুকুটহীন নবাব’। তা-ই ছিলেন তিনি, তখন এক বাক্যে বলেছেন সবাই। তাঁর বিদায়ে মনে-মনে লিখেছি এক প্রচ্ছদ-রচনা। তার শিরোনাম ‘শেষ নবাব’।

Comments

Popular posts from this blog

‘প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নৈতিক ক্ষমতা আছে’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, একতরফা কোন নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিগত ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় একতরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো নজির নেই। ৮৬ সালের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছিল তাও গ্রহণযোগ্যতা পেত না। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। গতকাল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা নাগরিক হিসাবে উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগের যায়গা থেকেই প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়েছি। আমরা প্রেসিডেন্টের কাছে একই সুরে কথা বলেছি। আমাদের মূল আহ্বান ছিল একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়ে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা আমরা স্পষ্ট করেছি। সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ও সহিংস কর্মসূচিগুলো অবস্থার অবনতি ঘটছে তাও আমরা তুলে ধরেছি। আমরা মনে করি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু সমাধানের আগেই নির্বাচনে সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। এটা আমাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আপনাদেরকে প্রেসিডেন্ট কি আশার বাণী ...

বিএনপিকে নির্মূল করতে মরিয়া সরকার: ফখরুল

বিএনপিকে নির্মূল করতে সরকার মরিয়া বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে ফখরুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মামলায় ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ও জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ গতকাল আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, জনবিচ্ছিন্ন আওয়ামী সরকার বিএনপিসহ দেশের বিরোধী দলগুলোকে নির্মূল করে একদলীয় দু:শাসনকে দীর্ঘায়িত করতেই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ উদ্ভট, মনগড়া ও ভিত্তিহীন মামলা দায়েরের মাধ্যমে তাদেরকে কারাগারে পুরে রাখছে। মূলত: শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপিকে নির্মূল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল  কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বলেই গতকাল তার জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মির্জা ফখরুল অবিলম্বে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ এর বিরু...

অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিন- রাজনীতির নামে নৃশংসতা

যাত্রীসমেত বাসে পেট্রলবোমা মেরে ১৯ জন মানুষকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা যে রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না, এটা কে না জানে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা যেন এ রকমই! এ দেশের মানুষের জীবনযাপন আজ এভাবেই জিম্মি হয়ে পড়েছে নৃশংস রাজনৈতিক কৌশলের হাতে। ১৮-দলীয় জোটের তিন দিনের অবরোধের শেষ দিন গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনাটির নিন্দা এবং ধিক্কার জানানোর ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। নিরীহ ১৯ জন মানুষ, যাঁদের দুজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন, আরও কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। তাঁদের এবং তাঁদের স্বজনদের প্রতি জানাই সান্ত্বনা ও সমবেদনা। পেট্রলবোমার শিকার হওয়া বাসটি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি মডেল। সেটিতে বাসচালক ও তাঁর সহযোগী ছাড়াও ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ—ছাত্র, ব্যাংকের কর্মকর্তা, পুলিশের কনস্টেবল, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। তাঁরা কাজ শেষে ঘরে ফিরছিলেন। কী অপরাধ ছিল তাঁদের? কেন এই নৃশংসতার শিকার তাঁদের হতে হলো? এমন নৃশংসতার ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে সারা দেশের মানুষ। বিরোধী দলের তিন দিনের অবরোধে না...