Skip to main content

গদ্যকার্টুন- গাছেরটাও খান, তলারটাও কুড়োন... by আনিসুল হক

আপনার অসুখ করেনি। কিন্তু আপনাকে দেওয়া হলো অভিজাত চিকিৎসাসেবা। আপনি ভোটে দাঁড়াননি। কিন্তু আপনি হয়ে গেলেন নির্বাচিত সাংসদ। আপনি অসুস্থ, কিন্তু আপনি খেলতে গেছেন গলফ। আপনার বউয়ের সঙ্গে আপনার বিরোধ।
আপনি এখন বিরোধীদলীয় নেত্রীর সম্মানিত ও গর্বিত স্বামী। আপনার অবস্থান সরকারবিরোধী, কিন্তু আপনি হলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। আপনি শপথ করেছিলেন, আপনি সুইসাইড করবেন, শেষে আপনি শপথ নিলেন সাংসদ হিসেবে। আপনি ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী, এখন দুই গণতান্ত্রিক দলের সবচেয়ে কাম্য ধন।

আপনিটা কে?
আপনারা জানেন এই ধাঁধার উত্তর।
এটা ছড়িয়েছে ফেসবুকে। কেউ একজন রচনা করেছেন। আদিতে কে করেছেন জানি না, তাই কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে পারলাম না।
আচ্ছা, আপনি কে? এই নিয়ে একটা কৌতুক প্রচলিত আছে। বুশ-সংক্রান্ত কৌতুক। এটা আগে বলে নিই।
বুশ গেলেন ব্রিটেনে। তিনি রানিকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, ব্রিটেনে দেশ চালানো হয় কীভাবে?
রানি বললেন, বুদ্ধি দিয়ে।
কেমন?
আচ্ছা, এই যে টনি ব্লেয়ার। ওকে আমি জিজ্ঞেস করব একটা ধাঁধা। আচ্ছা টনি, বলো তো, একটা লোক, সে তোমার বাবার ছেলে, সে তোমার মায়ের ছেলে, তোমার আর কোনো ভাইবোন নেই। লোকটা?
টনি উত্তর দিল: আমি।
দেখলে, টনির কত বুদ্ধি? এভাবে টনি ব্লেয়ার বুদ্ধি দিয়ে দেশ চালায়।
বুশ আমেরিকায় ফিরে গেলেন। তাঁর মন্ত্রীদের ডেকে বললেন, বলো তো, একটা লোক, সে তোমার বাবার ছেলে, সে তোমার মায়ের ছেলে, তোমার আর কোনো ভাইবোন নেই, লোকটা কে?
পুরো মন্ত্রিসভা তখন নিশ্চুপ। কী কঠিন ধাঁধা রে বাবা!
তখন বুশ বললেন, পাওয়েল কই? পাওয়েল থাকলে নিশ্চয়ই এর উত্তর দিতে পারত। ডেকে আনা হলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েলকে। তাঁকেও জিজ্ঞেস করা হলো একই প্রশ্ন: একটা লোক, সে তোমার বাবার ছেলে, সে তোমার মায়ের ছেলে, তোমার আর কোনো ভাইবোন নেই, লোকটা কে?
পাওয়েল বললেন, আমি।
বুশ বললেন, হয় নাই, গাধা! সঠিক উত্তর হবে, টনি ব্লেয়ার।
বুশের আরেকটা কৌতুক বলি।
বুশ গেছেন একটা স্কুল পরিদর্শন করতে।
একটা ছেলে বলল, আমার দুটো প্রশ্ন আছে। এক. আপনি কম ভোট পেয়েও কী করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন? দুই. ইরাকে কোনো ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায় নাই। এ সত্ত্বেও আপনি কেন ইরাকে হামলা করলেন? এতগুলো নারী-শিশুর মৃত্যুর কারণ হলেন?
ঢং করে ঘণ্টা বাজল। বুশ বললেন, এখন ১০ মিনিটের বিরতি। বিরতির পর আবার শুরু হবে।
এবার আরেকটা ছেলে দাঁড়াল।
সে বলল, আমার তিনটা প্রশ্ন আছে। এক. আপনি কম ভোট পেয়েও কী করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন? দুই. ইরাকে কোনো ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায় নাই। এ সত্ত্বেও আপনি কেন ইরাকে হামলা করলেন? এতগুলো নারী-শিশুর মৃত্যুর কারণ হলেন? তিন. বিরতির আগে দুটো প্রশ্ন করেছিল যে ছেলেটা, সে কোথায় গেল?
আমরাও কিন্তু একই প্রশ্ন করতে পারি।
একটা করতে পারি ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে। আপনি যদি অবরোধ-হরতালের কর্মসূচি থেকে সরেই এলেন—সরে আসার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ—আর এখন সংলাপের কথা বলছেনই, সেই সরকারের সঙ্গে সংলাপ, যা আপনার ভাষায় অবৈধ, তাহলে কেন এই কাজ আগে করলেন না? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেদিন আপনার বেঁধে দেওয়া সময়ের আগেই আপনাকে কর্মসূচি স্থগিত করে সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন, সেদিন কেন আপনি হরতাল স্থগিত করে আলাপে গেলেন না? কী হতো গণভবনে গিয়ে এক কাপ চা খেলে? মধ্যখান থেকে এত যে মৃত্যু, এত যে অগ্নিদাহ, এগুলোর দায় কে নেবে?
আর শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা যায়, আপনি ১৫৩টা আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া সাংসদকে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সাংসদ বলতে পারেন কি না?
আর এই কৌতুক-আলোচনার সূত্র ধরে ডা. দীপু মনি বলতে পারেন, ব্রিটেনের রানির ধাঁধার জবাবটা আমি দিতে পারব। আপনারা কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করছেন না কেন? আমি তো পারতাম।
আমি কয়েকজন সাধারণ মানুষ, রিকশাওয়ালা, আমাদের আত্মীয়স্বজনকে জিজ্ঞেস করলাম, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষ কী বলছে?
তাঁরা সবাই নানা বাক্যে যা বলেছেন, তা হলো, মানুষ বলছে, ক্ষমতায় কে এল, কে গেল, আমাদের কিছু যায়-আসে না। আমরা শান্তি চাই। আমরা জানতে চাই, আমাদের পথ চলাচলের জন্য বাধাহীন হবে তো? বাড়ি থেকে বেরোলে আমি অক্ষত দেহে ফিরে আসতে পারবে তো? আমার গায়ে কেউ পেট্রলবোমা ছুড়ে মারবে না তো? আমি আমার দোকানপাট খুলতে পারব তো? আমার বাস-ট্রাক-অটোরিকশা নিয়ে আমি
যে রাস্তায় বেরোব, তাতে কেউ আগুন দেবে না তো? আমি যে সবজি বা দুধ উৎপাদন করছি, তা বিক্রি হবে তো? আপনারা থাকেন আপনাদের পলিটিকস নিয়ে, আমাদের বাঁচতে দিন। আমাদের কাজকর্ম করতে দিন। আমাদের শিশুদের স্কুলে যেতে দিন।
আমাদের প্রবৃদ্ধি এ বছর কমে যাবে, বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস। আমাদের এখন দরকার কাজ করা। দেশের মানুষ নিজের উদ্যোগে নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে কাজ করে যাবে, যাচ্ছে। কিন্তু তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় রাজনীতি।
গণতন্ত্র নামের বাইসাইকেলের দুটো চাকা।
একটা সরকারি দল, একটা বিরোধী দল।
আমাদের সরকারি চাকাটা আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাতে অবশ্য জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টিরও স্পোক দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু বিরোধী চাকা কোনটা? জাতীয় পার্টি?
জানি না। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন। গাছেরটাও খাবেন, তলারটাও কুড়াবেন...সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বাচনভঙ্গিটা অননুকরণীয়। এটা কেউ নকল করতে পারবে বলে মনে হয় না। সে চেষ্টা না-হয় আমরা না-ই করলাম।
ওঁরা গাছেরটাও খান, তলারটাও কুড়োন, আমরা তো সেই খাবারের ভাগ চাইছি না। আমরা চাই, আমাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রমের ফলটা নিয়ে যেন দারাপুত্রপরিবার মিলে একটু শান্তিতে দিন গুজরান করতে পারি।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

Comments

Popular posts from this blog

‘প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নৈতিক ক্ষমতা আছে’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, একতরফা কোন নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিগত ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় একতরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো নজির নেই। ৮৬ সালের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছিল তাও গ্রহণযোগ্যতা পেত না। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। গতকাল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা নাগরিক হিসাবে উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগের যায়গা থেকেই প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়েছি। আমরা প্রেসিডেন্টের কাছে একই সুরে কথা বলেছি। আমাদের মূল আহ্বান ছিল একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়ে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা আমরা স্পষ্ট করেছি। সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ও সহিংস কর্মসূচিগুলো অবস্থার অবনতি ঘটছে তাও আমরা তুলে ধরেছি। আমরা মনে করি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু সমাধানের আগেই নির্বাচনে সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। এটা আমাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আপনাদেরকে প্রেসিডেন্ট কি আশার বাণী ...

বিএনপিকে নির্মূল করতে মরিয়া সরকার: ফখরুল

বিএনপিকে নির্মূল করতে সরকার মরিয়া বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে ফখরুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মামলায় ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ও জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ গতকাল আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, জনবিচ্ছিন্ন আওয়ামী সরকার বিএনপিসহ দেশের বিরোধী দলগুলোকে নির্মূল করে একদলীয় দু:শাসনকে দীর্ঘায়িত করতেই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ উদ্ভট, মনগড়া ও ভিত্তিহীন মামলা দায়েরের মাধ্যমে তাদেরকে কারাগারে পুরে রাখছে। মূলত: শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপিকে নির্মূল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল  কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বলেই গতকাল তার জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মির্জা ফখরুল অবিলম্বে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ এর বিরু...

অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিন- রাজনীতির নামে নৃশংসতা

যাত্রীসমেত বাসে পেট্রলবোমা মেরে ১৯ জন মানুষকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা যে রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না, এটা কে না জানে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা যেন এ রকমই! এ দেশের মানুষের জীবনযাপন আজ এভাবেই জিম্মি হয়ে পড়েছে নৃশংস রাজনৈতিক কৌশলের হাতে। ১৮-দলীয় জোটের তিন দিনের অবরোধের শেষ দিন গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনাটির নিন্দা এবং ধিক্কার জানানোর ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। নিরীহ ১৯ জন মানুষ, যাঁদের দুজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন, আরও কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। তাঁদের এবং তাঁদের স্বজনদের প্রতি জানাই সান্ত্বনা ও সমবেদনা। পেট্রলবোমার শিকার হওয়া বাসটি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি মডেল। সেটিতে বাসচালক ও তাঁর সহযোগী ছাড়াও ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ—ছাত্র, ব্যাংকের কর্মকর্তা, পুলিশের কনস্টেবল, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। তাঁরা কাজ শেষে ঘরে ফিরছিলেন। কী অপরাধ ছিল তাঁদের? কেন এই নৃশংসতার শিকার তাঁদের হতে হলো? এমন নৃশংসতার ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে সারা দেশের মানুষ। বিরোধী দলের তিন দিনের অবরোধে না...