Skip to main content

সরেজমিন- ভোটের দিন সাতক্ষীরায় by ইফতেখার মাহমুদ

যশোর সদর থেকে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার দূরত্ব ৯০ কিলোমিটারের মতো। কিন্তু যখন তালায় পৌঁছলাম, তখন মোটরসাইকেলের মিটার যাত্রার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ১৩০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে দেখাল।
প্রধান সড়ক দিয়ে যাওয়া যায়নি। অবরোধকারীদের হাতে তিন দফা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে অগত্যা ঘুর পথে গ্রামের ভেতর দিয়ে তালায় পৌঁছতে হয়েছে। তাই বাড়তি এই পথ পেরোনো। তালায় রওনা হওয়ার আগে বন্ধু ও সহকর্মীদের বারবার সাবধানবাণী শুনতে শুনতে আমার ভেতরেও যে ভয় ধরেনি, তা নয়। কিছুটা আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা নিয়েই তালার মাটিতে পা রাখলাম।
কিন্তু তালায় পৌঁছার পর ভয় কিছুটা হলেও ভাঙল। মহাসড়ক ও গ্রামীণ সড়কগুলোতে সুনসান নীরবতা। কোথাও অবরোধকারীদের দেখা মিলল না। পথে পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল চোখে পড়ল। বিকেলে তালা উপজেলা সদরে পৌঁছার পর দেখা গেল, বাজারের বেশির ভাগ দোকান বন্ধ। মোটরসাইকেলের চালক বারবার সাবধান করে দিয়ে মনের ভেতর পেট্রলবোমা ছোড়ার ভয় জাগিয়ে দিচ্ছিলেন। কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই নির্বাচনের আগের দিনটি পার হলো।
নির্বাচনের দিন সকালে ভোট দেখতে বের হলাম। তিন-চারটি কেন্দ্রে ভোট দেখার পর দুপুর ১২টার দিকে তালার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মহাবিদ্যালয় কেন্দ্রে গেলাম। সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে এসেছেন তাঁরা। ওই কেন্দ্রে প্রবেশ করার ঠিক আগ মুহূর্তে মুঠোফোনে খবর এল, জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা ইসলামকাঠি ইউনিয়নের বেশির ভাগ কেন্দ্রের পাশে জড়ো হচ্ছেন। তাঁরা চারটি কেন্দ্রে যাওয়ার সড়ক বিদ্যুতের খুঁটি ও গাছ ফেলে আটকে অবরোধ সৃষ্টি করেছেন। ডাঙ্গা আলিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্র দখল করে সেখানে ধারালো অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নিয়েছেন জামায়াতের কর্মীরা।
এই খবর শোনার পর বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জানালাম। তাঁরা ইসলামকাঠি ইউনিয়নের বিভিন্ন কেন্দ্রে অবরোধ সৃষ্টির সংবাদটি সঠিক নয় বলে উড়িয়ে দিলেন। আরেকটু আগ বাড়িয়ে বললেন, ছোটখাটো কিছু অবরোধ ছিল, তা পুলিশ-বিজিবি কিছুক্ষণ আগে সরিয়ে ফেলেছে। এখন কোথাও কোনো সমস্যা নেই। সবাই শান্তিমতো ভোট দিচ্ছেন। নির্বাচনী কর্মকর্তারা যখন এসব কথা বলছেন, তখন আবারও মুঠোফোনে ডাঙ্গা কেন্দ্র থেকে খবর এল, ভোট দিতে আসা একজন বৃদ্ধাকে জামায়াতের কর্মীরা তুলে নিয়ে গেছেন। ভোটকেন্দ্রে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন তাঁরা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে আরেকজন স্থানীয় সাংবাদিককে সঙ্গে নিয়ে ইসলামকাঠি ইউনিয়নের পথে রওনা হলাম। বেলা তখন একটা। সড়ক দিয়ে যাওয়ার পথে চারটি কেন্দ্র অতিক্রম করলাম। বেশির ভাগ কেন্দ্র ফাঁকা। রাস্তায়ও কোনো লোকজন চোখে পড়ল না। যে দু-একজন পথচারী চোখে পড়ল, তাদের চোখে-মুখে আতঙ্ক। ডাঙ্গা কেন্দ্রে যাওয়ার পথে দেখলাম, সত্যি সত্যি বাঁশ, গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে রাখা হয়েছে। দূর থেকে নির্বাচনী কেন্দ্র দেখা যাচ্ছে। নির্বাচন প্রতিরোধকারীরা সেখানে মিছিল করছে। আমাদের দেখে সেখান থেকে কয়েকজন তেড়ে এল।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আমরা পিছু হটলাম। সঙ্গে থাকা স্থানীয় সাংবাদিকেরা তালা থানার যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে খবর দিলেন। ১০-১৫ মিনিট অপেক্ষা করার পর বিজিবি ও পুলিশের দুটি গাড়ি এসে উপস্থিত হলো। তারা প্রায় ২০টি ফাঁকা গুলি ছুড়ল। অবরোধকারীদের সঙ্গে তাদের কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটল। শেষ পর্যন্ত অবরোধকারীরা পিছু হটল।
এ ঘটনা যখন চলছিল তখন স্থানীয় অন্য সাংবাদিকেরা কিছুক্ষণ পর পর ফোন দিচ্ছিলেন। ইসলামকাঠি ইউনিয়ন এলাকা ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছিলেন তাঁরা। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাই বিজিবির গাড়ির পেছন পেছন ইসলামকাঠি ইউনিয়ন এলাকা ত্যাগ করলাম। সন্ধ্যায় নির্বাচনের
ফলাফল ঘোষণার সময় দেখা গেল, তালা থানার পুলিশের দুজন কর্মকর্তা কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে গুলি ছোড়ার অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর নিচ্ছেন।
নির্বাচনের দিন বিকেল পর্যন্ত তালা উপজেলার কমপক্ষে ১৫টি কেন্দ্র ঘুরে দেখা হলো। তিনটি কেন্দ্রে সারি ধরে ভোটারদের ভোট দিতে দেখা গেল। বাকিগুলোতে নির্বাচনসংক্রান্ত কর্মকর্তা ও প্রার্থীদের পক্ষের লোকদের তুলনায় ভোটারের সংখ্যা কম দেখা গেল।
পরদিনের প্রথম আলোতে ডাঙ্গা ইউনিয়নের অবরোধ ও সংঘাতের সংবাদসহ নির্বাচন বিষয়ে প্রতিবেদন ছাপা হলো। সকালে সাতক্ষীরা সদরে প্রথম আলো কার্যালয়ে পৌঁছালাম। পৌঁছার পরপরই প্রথম আলোর সাতক্ষীরার নিজস্ব প্রতিবেদক কল্যাণ ব্যানার্জির কাছে ফোন এল। সাতক্ষীরার জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে বলা হলো, ‘এ ধরনের কোনো অবরোধ ইসলামকাঠিতে হয়নি। সবকিছু শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। সবাই ঠিকমতো ভোট দিয়েছেন। আপনার পত্রিকায় সঠিক সংবাদ আসেনি।’
কল্যাণ ব্যানার্জি মুঠোফোনেই ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘আমাদের প্রতিবেদক ঘটনাস্থলে ছিলেন। তিনি যা দেখেছেন, তা-ই লিখেছেন।’ অপর প্রান্ত থেকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলা হলো, ‘না, এমন কোনো কিছু ঘটেনি।’
ইফতেখার মাহমুদ: সাংবাদিক।

Comments

Popular posts from this blog

‘প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নৈতিক ক্ষমতা আছে’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, একতরফা কোন নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিগত ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় একতরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো নজির নেই। ৮৬ সালের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছিল তাও গ্রহণযোগ্যতা পেত না। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। গতকাল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা নাগরিক হিসাবে উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগের যায়গা থেকেই প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়েছি। আমরা প্রেসিডেন্টের কাছে একই সুরে কথা বলেছি। আমাদের মূল আহ্বান ছিল একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়ে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা আমরা স্পষ্ট করেছি। সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ও সহিংস কর্মসূচিগুলো অবস্থার অবনতি ঘটছে তাও আমরা তুলে ধরেছি। আমরা মনে করি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু সমাধানের আগেই নির্বাচনে সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। এটা আমাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আপনাদেরকে প্রেসিডেন্ট কি আশার বাণী ...

বিএনপিকে নির্মূল করতে মরিয়া সরকার: ফখরুল

বিএনপিকে নির্মূল করতে সরকার মরিয়া বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে ফখরুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মামলায় ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ও জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ গতকাল আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, জনবিচ্ছিন্ন আওয়ামী সরকার বিএনপিসহ দেশের বিরোধী দলগুলোকে নির্মূল করে একদলীয় দু:শাসনকে দীর্ঘায়িত করতেই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ উদ্ভট, মনগড়া ও ভিত্তিহীন মামলা দায়েরের মাধ্যমে তাদেরকে কারাগারে পুরে রাখছে। মূলত: শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপিকে নির্মূল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল  কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বলেই গতকাল তার জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মির্জা ফখরুল অবিলম্বে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ এর বিরু...

অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিন- রাজনীতির নামে নৃশংসতা

যাত্রীসমেত বাসে পেট্রলবোমা মেরে ১৯ জন মানুষকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা যে রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না, এটা কে না জানে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা যেন এ রকমই! এ দেশের মানুষের জীবনযাপন আজ এভাবেই জিম্মি হয়ে পড়েছে নৃশংস রাজনৈতিক কৌশলের হাতে। ১৮-দলীয় জোটের তিন দিনের অবরোধের শেষ দিন গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনাটির নিন্দা এবং ধিক্কার জানানোর ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। নিরীহ ১৯ জন মানুষ, যাঁদের দুজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন, আরও কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। তাঁদের এবং তাঁদের স্বজনদের প্রতি জানাই সান্ত্বনা ও সমবেদনা। পেট্রলবোমার শিকার হওয়া বাসটি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি মডেল। সেটিতে বাসচালক ও তাঁর সহযোগী ছাড়াও ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ—ছাত্র, ব্যাংকের কর্মকর্তা, পুলিশের কনস্টেবল, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। তাঁরা কাজ শেষে ঘরে ফিরছিলেন। কী অপরাধ ছিল তাঁদের? কেন এই নৃশংসতার শিকার তাঁদের হতে হলো? এমন নৃশংসতার ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে সারা দেশের মানুষ। বিরোধী দলের তিন দিনের অবরোধে না...