Skip to main content

চারুশিল্প- বাহারামের রূপবিদ্যা by মোবাশ্বির আলম মজুমদার

প্রতিষ্ঠান সনদ দেয়, বাহারামের সেটি নেই। তুলি ডুবিয়ে তবুও ক্যানভাসে রং মেশান তিনি। রিকশা, ট্যাক্সি, ট্রাক, লরি—এসব যানবাহনের গায়ে আঁকেন হরেক ছবি।
দুটো পয়সা জোটে। বেশ মজার এ রিকশা পেইন্টিংয়ের কাজ তিনি শুরু করেছিলেন ১১ বছর বয়সে।
‘এ মানুষটিকে একজন দর্শক হিসেবে বিভিন্ন প্রদর্শনীতে দেখতাম আমি। মাঝেমধ্যে এসে ছবি সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করতেন। বিরক্ত লাগত। কিন্তু একদিন নিজের আঁকা দুটি ছবি নিয়ে এলেন আমার কাছে। সেদিনই বুঝলাম, তিনি নিছক একজন রিকশা-পেইন্টার নন, জাত শিল্পী।’ বাহারামের সম্পর্কে শিল্পী নিসার হোসেন কথা এমনই।

তাঁর জন্ম ১৯৫০-এ, ঢাকায়। আদিনাম সৈয়দ কোমার হোসেন সিরাজী।
১৫ বছর বয়সে পাকাপাকিভাবে রিকশা পেইন্টিং শুরু করেন বাহারাম। কল্পনাশক্তির প্রখরতায় প্রতিনিয়ত রিকশায় আঁকার অভ্যাসকে পরিণত করেন নতুন নতুন বিষয়ে। সিনেমার ব্যানার আঁকায় হাতেখড়ি শিল্পী আবদুল হাইয়ের কাছে। তখন পুরোনো ঢাকার আগামসি লেনে কাজ করতে যেতেন তিনি। ১৯৬০ সালের দিকে বাহারাম নায়ক-নায়িকাদের প্রতিকৃতি চিত্রের মাধ্যমে সিনেমার ব্যানার আঁকায় দক্ষতা দেখান। সেই থেকে শুরু ব্যানারের কাজ। সেই সময়কার অনেক চিত্রতারকার মধ্যে ওয়াহিদ মুরাদ, ভারতীয় সুপারস্টার দিলীপ কুমার, কিশোর কুমার আর মধুবালার প্রতিকৃতি বেশ রপ্ত হয়ে যায় তাঁর।
এরপর রুটি-রুজির সংগ্রামে অনেক এগিয়ে গেলেন বাহারাম। কিন্তু সিনে ব্যানার আর রিকশা পেইন্টিং করে তৃপ্তি মেলে না তাঁর। অন্যদিকে, ডিজিটাল ব্যানার তৈরির প্রযুক্তির কারণে ওই বাজার ছোট হয়ে এলো। এবার বাহারামের মাথায় হাত। নব্বইয়ের দশক-পরবর্তী সময়ে সংকট গাঢ় হয়। শাড়ির ডিজাইনের কাজ শুরু করেন তিনি । এ সময় সবার দৃষ্টি কাড়েন ‘বৃত্তে’র কর্মশালায় অংশ নিয়ে। শিল্পকলার মূল স্রোতের সঙ্গে যুক্ত হলেন বাহারাম।
প্রথাগত ব্যাকরণসিদ্ধ শিল্পরচনার দিকে না গেলেও প্রথা না মেনে আঁকা তাঁর ছবিগুলো দৃষ্টি কেড়ে নেয় সবার। রং, রেখা-জ্যামিতি, বুনটের ধার ধারেন না তিনি। কিন্তু জাতশিল্পী হয়ে ওঠার সব সম্ভাবনা তাঁর কাজে উপস্থিত। তাঁর দৃষ্টি দুটি—অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী। প্রচলিত মিথ এসে ভর করে ছবির বিষয়ে। এ শিল্পীর ছবির বিষয় ও ছবি দেখে একটি জায়গায় এসে থমকে যান দর্শক—ছবির প্রতিটি অবয়বের ভেতর আকৃতির পুনঃস্থাপন করেছেন তিনি। যেমন: ‘আইস অব হান্টার’ কাজটিতে মানুষের মুখের চোখ দুটি ঢেকে আছে দুই হরিণের আকৃতি—হাত ও পা খর্বকায়। ছবির জমিনে গাঢ় নীলের মধ্যে সাদা চলমান রেখা। এক অদ্ভুত ভাবনা তাড়িয়ে নেয় দর্শককে। স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে।
বাহারামের ছবির দৌড় অনেক দূর। বিষয়-ভান্ডার অফুরন্ত। বিষয়ের মধ্যে কোনো পরিবর্তনের স্লোগান হয়তো পাওয়া যায় না, কিন্তু একটি বার্তা পাওয়া যায় । শিল্পী কখনো নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলেন। প্রতিকৃতির মধ্যে হাজির করেন পশু, পাখি, প্রকৃতি। গতি তৈরি করেন বহির্মুখী ফর্ম দিয়ে। ফলে ছবির কেন্দ্রে দৃষ্টি নিবদ্ধ না হয়ে কানভাসের বাইরেও আনন্দ খুঁজে পান দর্শক।
‘এলিফ্যান্ট সোসাইটি’ ছবির মধ্যে আছে মানুষের আকৃতির ঠাসাঠাসি উপস্থিতি। জমিনে আলট্রামেরিন ব্লু। হয়তো আকাশের কথা বলেন শিল্পী। মানুষের বন্ধনকে দেখান হাতির সঙ্গে।
বাহারাম আসলে কী আঁকেন—এমন প্রশ্নের জবাবে হয়তো বলা যাবে: সমাজ, মানুষ, বোধ-বুদ্ধির অন্তর্ধান, তথাকথিত সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে চাটুকারিতা এবং অন্তর্জগতের যন্ত্রণা নির্মাণ করেন বাহারাম। প্রতিষ্ঠানের বিপক্ষে তিনি নন, কবে প্রতিষ্ঠানবঞ্চিত বাহারামের শিল্প ও রূপের বিদ্যা আমাদের বলে দেয়—শিল্প সাধনার বিষয়, জীবনও তা-ই। শিল্প ও জীবন এক হয়েই তৈরি হয় তাঁর ছবির জগত। বাহারামের ছবিগুলো আমাদের খুলে দিয়েছে নতুন এক দরোজা। ১১ জানুয়ারি ঢাকা আর্ট সেন্টারে শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী শেষ হবে ২১ জানুয়ারি।

Comments

Popular posts from this blog

‘প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নৈতিক ক্ষমতা আছে’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, একতরফা কোন নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিগত ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় একতরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো নজির নেই। ৮৬ সালের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছিল তাও গ্রহণযোগ্যতা পেত না। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। গতকাল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা নাগরিক হিসাবে উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগের যায়গা থেকেই প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়েছি। আমরা প্রেসিডেন্টের কাছে একই সুরে কথা বলেছি। আমাদের মূল আহ্বান ছিল একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়ে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা আমরা স্পষ্ট করেছি। সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ও সহিংস কর্মসূচিগুলো অবস্থার অবনতি ঘটছে তাও আমরা তুলে ধরেছি। আমরা মনে করি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু সমাধানের আগেই নির্বাচনে সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। এটা আমাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আপনাদেরকে প্রেসিডেন্ট কি আশার বাণী ...

আই কিউ- মে'২০১১

আই কিউ মে'২০১১ ১। যদি একটি শার্ট শুকাতে ১০ মিনিট সময় লাগে তবে ১০টি শার্ট শুকাতে কত সময় লাগবে ? (ক) ১০ মিনিট (খ) ৪০ মিনিট (গ) ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট (ঘ) ১ ঘন্টা ৪০ মিনিট। ২। নিচের কোন জন অন্যদের থেকে আলাদা ? (ক) কাজী নজরুল ইসলাম (খ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (গ) আল মাহমুদ (ঘ) সুকুমার রায়। ৩। সফল হতে হলে আপনাকে অবশ্যই হতে হবে- (ক) রসিক (খ) পরিশ্রমী (গ) বাধ্য (ঘ) ধনী। ৪। পল্লী কবি বলা হয় কাকে ? (ক) কাজী নজরুল ইসলাম (খ) ফররুখ আহমদ (গ) সুকুমার রায় (ঘ) জসীম উদ্দিন। ৫। ডাব না খেলে কি হয় ? আইকিউ এপ্রিল’১১ এর সমাধান ঃ (১) ৬টি (২) টাকাটা পুড়ে ফেলবেন (৩) ১৭ টি (৪) প্রেসার বেড়েছে (৫) ডিম (বাচ্ছা জন্মানোর আগেই আমরা খেয়ে ফেলি। বিরাম চিহ্নের প্রতি আরো বেশি যতœবান হতে হবে) তিনটির সঠিক জবাব দিয়েছেন- পূর্ণিমা আক্তার, তারেক হোসেন, সাজিয়া আক্তার সীমা, আবদুস সালাম, মোবারক উল্যা ত্বোহা, আনোয়ার হোসেন, ইমরান মুহাম্মদ, আসমা আক্তার, চরপাতা, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর। উম্মে হানি, নতুন বাজার, রায়পুর, আরজুন নাহার (মিতু), হাফিজুর রহমান আকাশ, মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন, সাহেদুল ইসলাম রাজু, রায়পুর আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর...

ফিল্মি কায়দায় ৩ জঙ্গি ছিনতাই by মতিউল আলম, খালিদ মাসুদ, ও সাইফুল ইসলাম সানি

ফিল্মি স্টাইলে পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে সাজাপ্রাপ্ত ৩ জেএমবি সদস্যকে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ছিনতাইয়ের সাত ঘণ্টার মাথায় টাঙ্গাইল থেকে জঙ্গি সদস্য রাকিবকে গ্রেপ্তার করা হলেও বাকি দু’জনের খোঁজ মেলেনি। এদিকে এ ঘটনার পর সীমান্ত ও দেশের সব কারাগারে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার কারণে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে ক্লোজ ও অন্যজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এদিকে রাতে গাজীপুর থেকে জঙ্গি ছিনতাইয়ে সহযোগিতার অভিযোগে আটক জাকারিয়ার স্ত্রী স্বপ্নাকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল সকাল সোয়া ১০টায় আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে ময়মনসিংহের ত্রিশালে। ছিনতাইকৃত আসামিরা হলো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সালাউদ্দিন সালেহীন, রাকিব হাসান এবং যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বোমা মিজান। ঘটনার সময় দুর্বৃত্তদের এলোপাতাড়ি গুলি ও বোমার আঘাতে আতিকুর রহমান (৩২) নামে পুলিশের এক কনস্টেবল নিহত ও দুই পুলিশ সদস্য আহত হন। গুলিবিদ্ধ এসআই হাবিবুর রহমান (৫০) ও সোহেল রানাকে (৩০) ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।  নিহত আতিকের বাড়ি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার পণ ঘাগড়া গ্রামে। এ ঘটনার পর পালানোর সময় টাঙ্গাইলের সখিপুর থেকে জা...