Skip to main content

গদ্যকার্টুন- ভালা করি ঘর বানায়া কয় দিন? by আনিসুল হক

আচ্ছা, আপনাদেরও কি এই রকম হয়? ধরুন, একটা কাজ করতে হবে। ধরা যাক, আপনি কাউকে একট চিঠি লিখবেন, বা কোনো একটা বিল জমা দেবেন,
কোনো একটা কিছুর জন্য আবেদন করবেন। কাজটা করার জন্য আরও তিন মাস সময় হাতে আছে। আপনি প্রথমে ভাবলেন ঠিক আছে, দুই মাস সময় হাতে রেখেই কাজটা করে ফেলব। এক মাস যায়, দুই মাস যায়, তারপর যখন তিন মাস যায় যায়, তখন আপনার হুঁশ হয়, এবং একেবারে শেষের দিন গিয়ে কাজটা সারেন?
যদি আপনার এই রকম হয়ে থাকে, তাহলে বুঝবেন, আপনি আমারই দলে। এবং আমার ধারণা, বেশির ভাগ মানুষই আসলে কাজ ফেলে রাখে, এবং শেষ মুহূর্তের আগে কাজ শেষ করে না। আপনারা যাঁরা আমার মতোই শেষ দিনের আগে কাজ শেষ করেন না, তাঁদের জন্য নিউ ইয়ার রেজুলেশন, নতুন বছরের অঙ্গীকার:
নতুন বছরে আমি হব ভালো ছেলে
সময়ে সারব কাজ রাখব না ফেলে।
আপনার মূল্যবান সময় কি ফেসবুকে অপব্যয়িত হচ্ছে? তাহলে আসুন, নতুন বছরে এই প্রতিজ্ঞা করি:
নতুন বছরে আমি এই পণ করি
ফেসবুক না পড়ে যেন সত্যি বই পড়ি।
আমার ওজন বেড়ে যাচ্ছে। ভুঁড়ি সামলাতে পারছি না। জিমনেসিয়ামে যাবার জন্য বার্ষিক কার্ড করেছিলাম, টাকা ব্যয় হয়েছে, ক্যালরি খরচ হয় নাই। একটা মেশিন কিনেছি, ব্যায়ামের যন্ত্র, সেটা ঘরের একটা কোণে অযত্নে পড়ে আছে, প্রথম দুই-তিন দিনই যা শরীরচর্চা হয়েছে, তারপর বেমালুম ভুলে গেছি সেই যন্ত্রের কথা। আপনাদেরও কি এই রকম হয়?
তাহলে আসুন, প্রতিজ্ঞা করি:
নতুন বছরে আমি এই করি পণ
খাওয়া কম ব্যায়াম বেশি কমাব ওজন।
ইনশা আল্লাহ, আগামী নতুন বছর পর্যন্ত যদি বেঁচে থাকি, আগামী বছরেও এই প্রতিজ্ঞাগুলোই নতুনভাবে উচ্চারণ করতে পারব। মানুষ প্রতিজ্ঞা করে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করার জন্যই।
এই জন্যই তো লোকে বলে, সিগারেট ছাড়া খুব সোজা। আমি আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে বহুবার সিগারেট ছেড়েছি।
আমি অবশ্য ধূমপান করি না। এই প্রতিজ্ঞা তাই আমাকে করতে হয় না, এই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করবারও দরকার পড়ে না।
***

এই পর্যন্ত পড়ার পর অনেকেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবেন। দেশের পরিস্থিতি ভয়াবহ। একতরফা একটা নির্বাচন সামনে। বিরোধী জোট সেই নির্বাচন বর্জন করেছে। অর্ধেকের বেশি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হয়নি। দেশে চলছে লাগাতার অবরোধ, লাগাতার হরতাল, লাগাতার বোমাবাজি, লাগাতার অগ্নিসংযোগ। দ্যাশ শ্যাষ। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ, কৃষকদের কপাল পুড়ে ছাই, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রবৃদ্ধি ৫-এর নিচে নেমে যেতে বাধ্য। নেতাদের আছে শুধু ক্ষমতাপ্রীতি। কেউ দেশের কথা ভাবছে না। এই অবস্থায় আপনি রসিকতা করেন। এই অবস্থায় তুমি মিয়া ক্যালরি, কোলেস্টেরল, ফেসবুক নিয়া ঘ্যানর ঘ্যানর করো।
তিন বছর ধরে একই কথা বলছি। বলছি যে, একতরফা নির্বাচন চাই না, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাই। বলছি, ভোটে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন চাই। কেউ আমার কথা শুনেছে?
গতকাল একজন সাবেক রাষ্ট্রদূত বললেন, বাংলাদেশে আছে আসল গণতন্ত্র। বকাওয়ালা বকে যাচ্ছে, লেখাওয়ালা লিখে যাচ্ছে, শোনাওয়ালা শুনে যাচ্ছে, করাওয়ালা নিজের মতো করে যাচ্ছে। এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।
প্রথম আলো লিখেছে, হাল ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। আশ্চর্য একটা দল। জরিপ বলছে, তারা জনপ্রিয়। জরিপ বলছে, তাদের দাবি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বেশির ভাগ মানুষই চায়। তার পরেও তাদের আন্দোলনে লোক হয় না। দেড় কোটি মানুষের শহরে দেড় লাখ না হোক, ১৫ হাজার লোক পথে নামবে না? নামবে কেন, কোনো নেতা নেমেছেন? নামবেন কী করে, সব নেতা তো কারাগারে। কথা কি সত্য? টিভি টক শোতে তো এখনো বিএনপির নেতাদের দেখি। কারণ হলো, বিএনপি সর্বহারাদের দল নয়। তাঁদের শরীরে মেদ আছে। নড়তে-চড়তে কষ্ট হয়।
শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকা কোনো গণতন্ত্রের জন্য বড় দুঃসংবাদ। আমরা এখন সেই দুঃসংবাদের মধ্যে আছি।
***

নতুন বছরে তাই আমরা কতগুলো রেজুলেশন নিতে পারি।
১. আগামী এক বছরে বাংলাদেশের সব জমি কিনে ফেলব।
২. আগামী এক বছরে বাংলাদেশের সব নদী ভরাট করে ফেলব।
৩. আগামী এক বছরে বাংলাদেশের সব গাছ কেটে ফেলব।
৪. আগামী এক বছরে প্রত্যেক সরকারি নেতার জন্য দুইটা করে টেলিভিশন চ্যানেল, পাঁচটা করে ব্যাংক, ছয়টা করে বিমা বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করব।
রসিকতা করছি। বুঝতেই পারছেন।
এবার একটা সিরিয়াস কথা। গত বছরের সবচেয়ে স্মরণীয় উক্তি হলো: ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না।’
***

না না, রাজনৈতিক আলোচনা বাদ। এখানে রাজনৈতিক আলোচনা নিষিদ্ধ। যে প্যাঁচ আপনি-আমি লাগাই নাই, যে সুতার কোনো অংশ, না ডগা, না মাঝখানেরটা, আপনার আমার ধরাছোঁয়ার মধ্যে নাই, সেই প্যাঁচ আমরা খুলব কীভাবে। যারা প্যাঁচ লাগিয়েছেন, কেবল তাঁরাই খুলতে পারবেন।
বরং আসুন, আমরা গান-বাজনা করি। হাসন রাজার গানটা গাই।
লোকে বলে বলে রে ঘরবাড়ি ভালা না আমার।
কী ঘর বানামু আমি শূন্যেরও মাঝার।
ভালা করি ঘর বানায়া কয় দিন রমু আর,
আয়না দিয়া চায়া দেখি পাকনা চুল আমার।

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

Comments

Popular posts from this blog

‘প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নৈতিক ক্ষমতা আছে’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, একতরফা কোন নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিগত ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় একতরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো নজির নেই। ৮৬ সালের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছিল তাও গ্রহণযোগ্যতা পেত না। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। গতকাল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা নাগরিক হিসাবে উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগের যায়গা থেকেই প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়েছি। আমরা প্রেসিডেন্টের কাছে একই সুরে কথা বলেছি। আমাদের মূল আহ্বান ছিল একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়ে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা আমরা স্পষ্ট করেছি। সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ও সহিংস কর্মসূচিগুলো অবস্থার অবনতি ঘটছে তাও আমরা তুলে ধরেছি। আমরা মনে করি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু সমাধানের আগেই নির্বাচনে সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। এটা আমাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আপনাদেরকে প্রেসিডেন্ট কি আশার বাণী ...

বিএনপিকে নির্মূল করতে মরিয়া সরকার: ফখরুল

বিএনপিকে নির্মূল করতে সরকার মরিয়া বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে ফখরুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মামলায় ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ও জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ গতকাল আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, জনবিচ্ছিন্ন আওয়ামী সরকার বিএনপিসহ দেশের বিরোধী দলগুলোকে নির্মূল করে একদলীয় দু:শাসনকে দীর্ঘায়িত করতেই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ উদ্ভট, মনগড়া ও ভিত্তিহীন মামলা দায়েরের মাধ্যমে তাদেরকে কারাগারে পুরে রাখছে। মূলত: শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপিকে নির্মূল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল  কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বলেই গতকাল তার জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মির্জা ফখরুল অবিলম্বে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ এর বিরু...

অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিন- রাজনীতির নামে নৃশংসতা

যাত্রীসমেত বাসে পেট্রলবোমা মেরে ১৯ জন মানুষকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা যে রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না, এটা কে না জানে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা যেন এ রকমই! এ দেশের মানুষের জীবনযাপন আজ এভাবেই জিম্মি হয়ে পড়েছে নৃশংস রাজনৈতিক কৌশলের হাতে। ১৮-দলীয় জোটের তিন দিনের অবরোধের শেষ দিন গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনাটির নিন্দা এবং ধিক্কার জানানোর ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। নিরীহ ১৯ জন মানুষ, যাঁদের দুজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন, আরও কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। তাঁদের এবং তাঁদের স্বজনদের প্রতি জানাই সান্ত্বনা ও সমবেদনা। পেট্রলবোমার শিকার হওয়া বাসটি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি মডেল। সেটিতে বাসচালক ও তাঁর সহযোগী ছাড়াও ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ—ছাত্র, ব্যাংকের কর্মকর্তা, পুলিশের কনস্টেবল, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। তাঁরা কাজ শেষে ঘরে ফিরছিলেন। কী অপরাধ ছিল তাঁদের? কেন এই নৃশংসতার শিকার তাঁদের হতে হলো? এমন নৃশংসতার ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে সারা দেশের মানুষ। বিরোধী দলের তিন দিনের অবরোধে না...