Skip to main content

তৃতীয় মত: অলঙ্কারিক সংসদ by মাহফুজ আনাম

সংসদ জনগণের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। জাতিকে দিক-নির্দেশনা দেয়ার জন্য জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী গঠন করা হয় সংসদ। যারা তাদের নির্বাচিত করেন সে জনগণের স্বার্থে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
যেখানে গণতন্ত্র পূর্ণমাত্রায় কাজ করে সেখানে ধারণা, আদর্শ এবং মতবিনিময়ের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। সংসদ এমন একটি জায়গা যেখানে গঠনমূলক বিতর্কের মাধ্যমে জাতীয় পরিকল্পনা গৃহীত হয়। যেখানে ব্যক্তির ক্ষমতা পরাভূত হয় সমষ্টিগত ইচ্ছার কাছে। দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের ভাগ্য এত ভালো নয়। আমাদের প্রারম্ভিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল এবং রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে। এরপর ১৬ বছর চলে যায় সামরিক সরকার এবং সেনা নেতৃত্বাধীন সরকারের মাধ্যমে। যখন জনগণের পক্ষে কথা বলার জন্য সতিক্যর অর্থে সংসদের কোন অস্তিত্বই ছিল না।
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর একটি কার্যকর এবং স্পন্দনশীল সংসদই ছিল আমাদের সর্বোচ্চ চাওয়া। কিন্তু আমাদের সে চাওয়া পূরণ হয়নি। এরশাদের পতনের পর প্রথম নির্বাচনে পরাজয় আওয়ামী লীগ কখনোই প্রসন্নচিত্তে গ্রহণ করেনি। প্রথম দিন থেকেই আক্ষরিক অর্থেই তারা সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু করে। প্রতিনিয়ত ওয়াকআউট, সংসদ বয়কটের মাধ্যমে সংসদের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করা, সর্বোপরি সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার এক বছর আগেই তারা সদলবলে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিল। ১৯৯৬ সালে বিএনপি যখন বিরোধী দলের আসনে বসে তখন তারা আওয়ামী লীগকে আরও রুক্ষতা এবং রুঢ়তার সঙ্গে ওই আচরণ ফেরত দিয়েছিল। ২০০১ এবং ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সামনে বিরোধী দলের আচরণ পরিবর্তনের সুযোগ এসেছিল। কিন্তু সে সুযোগ কাজে লাগানোর পরিবর্তে আমরা তাদের মধ্যে সংসদের ভেতরে-বাইরে সম্পর্ক আরও খারাপ হতে দেখলাম।
২৩ বছরের সংসদের এমন ইতিহাসের পর বুধবার যে দশম সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে এ সংসদের কাছে আমরা কি প্রত্যাশা করতে পারি। এ সংসদে এখন পর্যন্ত ২৯৮ আসনের মধ্যে ২৩২ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা রয়েছেন, যা মোট আসনের ৭৭ শতাংশ। জাতীয় পার্টির আসন ৩৪টি বা ১১%, ওয়ার্কার্স পার্টির (মেনন) ৬টি বা ২%, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ-ইনু) ৫টি বা ২%, জাতীয় পার্টির (মঞ্জু) ২টি, তরিকত ফেডারেশনের ২টি, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১৬টি বা ৫.৩%। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৭৭% আসনের তথ্যটিও পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ বাকি দলগুলো আওয়ামী লীগের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করেছে এবং আওয়ামী লীগের সমর্থনেই সংসদে প্রবেশ করেছে। শুধু তাই নয়, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ এবং তরিকত ফেডারেশনের প্রার্থীরা নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছেন, যা ছাড়া নির্বাচনে জয়লাভ তাদের পক্ষে আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব হতো।
কিছুদিনের মধ্যেই যখন সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নির্বাচিত হবেন তখন আওয়ামী লীগ পাবে আরো ৩৬টি আসন অর্থাৎ মোট ৩৫০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পাবে মোট ২৬৮টি আসন, পরে আরো দুটি আসন যোগ করা হতে পারে। স্বতন্ত্র হিসেবে জয়ী ১৬ সংসদ সদস্যও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী, তারা যেকোন সময় সরকারি দলে ঢুকে যেতে পারেন। জাতীয় পার্টি, যাদের সংসদে ৩৫টি আসন রয়েছে তারাও তা পেয়েছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে চুক্তি করে। এ অবস্থায় তাদের বিরোধী দলে থাকা হবে কেবই কাগুজে। এটা কেউ যুক্তি দেখাতে পারেন যখন সত্যিকার অর্থে বিরোধী দল তখন ভালো কী হয়েছে, তখনতো আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বছরের পর বছর সংসদ বয়কট করেছে। এটা সত্য হলেও সংসদীয় কমিটিগুলো বহুক্ষেত্রেই সঠিক কাজ করেছে। মার্জিনাল হলেও তারা কিছু ভালো কাজ করেছে। বুধবার সংসদে প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের দেয়া ভাষণ যদি মানদণ্ড হয় তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, দশম সংসদের বহু সময় ব্যয় হবে প্রধানমন্ত্রীর নীতির প্রশংসায়। প্রেসিডেন্টের ভাষণের  কোথাও আগের কোন ভুলভ্রান্তির কথা উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি গত ৫ই জানুয়ারি বিরোধী জোটের নির্বাচন বর্জন প্রসঙ্গেও কিছু বলা হয়নি। এর পরিবর্তে এ নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছে এবং সব দোষ চাপানো হয়েছে বিরোধীদের ওপর। অন্য অর্থে এ ভাষণ সরকারের নীতিরই প্রতিফলন।
গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার প্রাথমিক গুণ যদি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হয়ে থাকে, উন্নত শাসন ব্যবস্থার মূলনীতি যদি ভারসাম্যতা হয়ে থাকে এবং জনগণের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতির কথা বলা হয়, তার কোন কিছুই এখন বাংলাদেশে বিদ্যমান নেই। বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছেÑ কিভাবে আমরা আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারি এবং বিলুপ্তির পথে থাকা জবাবদিহিতা প্রক্রিয়াকে পুনরুদ্ধার করতে পারি। কিন্তু দশম সংসদ এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার কোন পথতো দেখাচ্ছে না এমনকি এব্যাপারে কোন দিকনির্দেশনাও দিচ্ছে না।

(মাহফুজ আনাম: ডেইলি স্টার সম্পাদক, পত্রিকাটিতে শুক্রবার প্রকাশিত মন্তব্য প্রতিবেদন থেকে অনূদিত)

Comments

Popular posts from this blog

‘প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নৈতিক ক্ষমতা আছে’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, একতরফা কোন নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিগত ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় একতরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো নজির নেই। ৮৬ সালের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছিল তাও গ্রহণযোগ্যতা পেত না। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। গতকাল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা নাগরিক হিসাবে উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগের যায়গা থেকেই প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়েছি। আমরা প্রেসিডেন্টের কাছে একই সুরে কথা বলেছি। আমাদের মূল আহ্বান ছিল একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়ে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা আমরা স্পষ্ট করেছি। সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ও সহিংস কর্মসূচিগুলো অবস্থার অবনতি ঘটছে তাও আমরা তুলে ধরেছি। আমরা মনে করি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু সমাধানের আগেই নির্বাচনে সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। এটা আমাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আপনাদেরকে প্রেসিডেন্ট কি আশার বাণী ...

বিএনপিকে নির্মূল করতে মরিয়া সরকার: ফখরুল

বিএনপিকে নির্মূল করতে সরকার মরিয়া বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে ফখরুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মামলায় ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ও জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ গতকাল আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, জনবিচ্ছিন্ন আওয়ামী সরকার বিএনপিসহ দেশের বিরোধী দলগুলোকে নির্মূল করে একদলীয় দু:শাসনকে দীর্ঘায়িত করতেই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ উদ্ভট, মনগড়া ও ভিত্তিহীন মামলা দায়েরের মাধ্যমে তাদেরকে কারাগারে পুরে রাখছে। মূলত: শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপিকে নির্মূল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল  কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বলেই গতকাল তার জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মির্জা ফখরুল অবিলম্বে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ এর বিরু...

অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিন- রাজনীতির নামে নৃশংসতা

যাত্রীসমেত বাসে পেট্রলবোমা মেরে ১৯ জন মানুষকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা যে রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না, এটা কে না জানে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা যেন এ রকমই! এ দেশের মানুষের জীবনযাপন আজ এভাবেই জিম্মি হয়ে পড়েছে নৃশংস রাজনৈতিক কৌশলের হাতে। ১৮-দলীয় জোটের তিন দিনের অবরোধের শেষ দিন গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনাটির নিন্দা এবং ধিক্কার জানানোর ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। নিরীহ ১৯ জন মানুষ, যাঁদের দুজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন, আরও কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। তাঁদের এবং তাঁদের স্বজনদের প্রতি জানাই সান্ত্বনা ও সমবেদনা। পেট্রলবোমার শিকার হওয়া বাসটি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি মডেল। সেটিতে বাসচালক ও তাঁর সহযোগী ছাড়াও ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ—ছাত্র, ব্যাংকের কর্মকর্তা, পুলিশের কনস্টেবল, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। তাঁরা কাজ শেষে ঘরে ফিরছিলেন। কী অপরাধ ছিল তাঁদের? কেন এই নৃশংসতার শিকার তাঁদের হতে হলো? এমন নৃশংসতার ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে সারা দেশের মানুষ। বিরোধী দলের তিন দিনের অবরোধে না...