Skip to main content

দশম সংসদ নির্বাচন- শপথ গ্রহণ নিয়ে সংশয়ের সুযোগ নেই by গওহর রিজভী

গত কয়েক দিনে সংবাদপত্রে, কলামের মন্তব্যে এবং টক শোর বিশেষজ্ঞদের বয়ানে ২৪ জানুয়ারি নবম সংসদের মেয়াদ বিলোপের আগেই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের আইনানুগ বৈধতা বিষয়ে পরস্পরবিরোধী মতামত দেওয়া হচ্ছে।
এসব আলোচনা অহেতুক জনগণের মনে সংশয় সৃষ্টি করছে। অবশ্য কিছু রাজনৈতিক নেতার এমন কথাবার্তায় তাঁদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিটা ধরা পড়ে। কিন্তু, বিজ্ঞ আইন বিশেষজ্ঞ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, প্রখ্যাত সম্পাদক এবং টেলিভিশন টক শোর অভ্রান্ত তারকারা একই ভুল করলে তা বোঝা কঠিন হয়। মোটা দাগে এর কারণ, মন্তব্যকারীরা বুঝে বা না বুঝে সংবিধানের বাছাই করা একটি অংশই পড়ছেন অথবা তাঁদের যুক্তির সঙ্গে বেমানান অংশগুলো এড়িয়ে যাচ্ছেন।

আমাদের সংবিধান সুনির্দিষ্ট, সুস্পষ্ট এবং সন্দেহ করার কোনো সুযোগ এতে রাখা হয়নি। সংবিধানের দুটি ভিন্ন অনুচ্ছেদে ‘শপথ গ্রহণ’ ও ‘কার্যভার গ্রহণের’ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রথমটি হলো ‘শপথ গ্রহণ’ যা কেবল সেই সব পদের বেলায় প্রযোজ্য, যেখানে শপথ গ্রহণের আবশ্যকতা রয়েছে; দ্বিতীয়টিতে কেবল সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের কার্যভার গ্রহণ বিষয় উল্লিখিত হয়েছে।
সংবিধানের ১৪৮(৩) অনুচ্ছেদে ‘পদের শপথ’ বিষয়ে সাধারণভাবে প্রযোজ্য বিধানটি পাওয়া যাবে। এতে বলা হচ্ছে:
‘এই সংবিধানের অধীন যে ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তির পক্ষে কার্যভার গ্রহণের পূর্বে শপথ গ্রহণ আবশ্যক, সেই ক্ষেত্রে শপথ গ্রহণের অব্যবহিত পর তিনি কার্যভার গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।’
মনে হয়, এই বিধির ‘শপথ গ্রহণের অব্যবহিত পর তিনি কার্যভার গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে’ অংশটির জন্য এ ব্যাপারে সংশয় জন্মেছে। এই ধারাকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের কার্যভার গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অপর একটি অনুচ্ছেদের সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে হবে।
কেউ যদি সংবিধানটি পুনরায় পাঠ করেন, তাহলে তিনি দেখতে পাবেন যে, আমাদের সংবিধান সংসদ-সদস্যদের বেলায় পরিষ্কার ব্যতিক্রমের সুযোগ করে রেখেছে। অনুচ্ছেদ ১২৩(৩)-এর শর্তাংশে ‘মেয়াদ-অবসানের কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে’ নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর এমপিদের কার্যভার গ্রহণের শর্ত ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সংবিধানের ১২৩(৩) উপধারা (ক) অনুসারে
৫ জানুয়ারির নির্বাচনে নির্বাচিত এমপিদের বেলায় মূলত এটাই ঘটেছে।
অনুচ্ছেদ ১২৩(৩)-এর শর্তাংশে বলা হয়েছে: ১২৩(৩) উপ-দফা (ক) অনুযায়ী অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিবর্গ ‘উক্ত উপ-দফায় উল্লিখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত, সংসদ-সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না’। সংবিধান সঠিকভাবেই অনুমান করেছে যে, নতুন সংসদের নির্বাচন পুরোনো সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে অনুষ্ঠিত হয়ে পরেরটি আগেরটিকে অধিক্রমণ করে ফেলতে পারে। সে কারণেই, পৃথকভাবে এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আমাদের সংবিধানের পরিকাঠামো রচনাকারীরা সম্ভবত এ ধরনের দ্বিধান্বিত পরিস্থিতির কল্পনা করেছিলেন, তাই সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে ‘শপথ ও ঘোষণাপত্র’ অংশে এটি আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ পাঠের জন্য প্রযোজ্য ফরম (নং ৫) এ ঘোষণা করা হচ্ছে: ‘আমি যে কর্তব্যভার গ্রহণ করিতে যাইতেছি, তাহা আইন-অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব; ...’। বিশেষভাবে লক্ষণীয়: ‘যে কর্তব্যভার গ্রহণ করিতে যাইতেছি’ শব্দাবলি দ্ব্যর্থহীনভাবে পরিষ্কার করছে যে, নতুন এমপিদের শপথ গ্রহণ এবং নিকট ভবিষ্যতে সম্ভাব্য কোনো তারিখে কার্যভার গ্রহণের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
এ মুহূর্তে এটা সুস্পষ্ট যে, একই সঙ্গে দুটি সংসদ—নবম ও দশম—বিরাজ করার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। নবম সংসদ ২৪ জানুয়ারিতে বিলুপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। দশম সংসদ ২৫ জানুয়ারি বা এর পরে যথাশিগগির সম্ভব কোনো দিনে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক আহূত হওয়ার পরই বহাল হবে।
একই সঙ্গে এটাও পরিষ্কার করা দরকার, নবম সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় কেন দশম সংসদের সদস্যদের জরুরিভাবে শপথ গ্রহণ করতে হলো। এটি আবশ্যিক হয়েছে, একই সঙ্গে বাস্তবতা বিবেচনা ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্য। সংবিধানের ১৪৮(২ক) অনুচ্ছেদের অধীনে নতুন নির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণ পরিচালনা সংসদের স্পিকারের জন্য বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনার কিছু অনিবার্য বাস্তব ও কারিগরি কারণও রয়েছে। প্রথমত, শপথ গ্রহণের পরই কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ দল তাদের সংসদীয় নেতা নির্বাচিত করতে পারে। দ্বিতীয়ত, যতক্ষণ না সংসদীয় নেতা নির্বাচিত হবেন, ততক্ষণ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা রাষ্ট্রপতিকে নতুন সংসদের সভা আহ্বানের (পুরোনো সংসদ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর) জন্য অনুরোধ করতে পারেন না। তৃতীয়ত এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যিনি সংসদের নেতা নির্বাচিত হবেন, তিনি একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী-পদাধিকারী (prime minister-designate)। তাঁকে তাঁর মন্ত্রিপরিষদ বাছাই করতে হবে, তাদের শপথ নেওয়াতে হবে এবং বিলম্ব ছাড়াই রাষ্ট্রের কার্যাবলি শুরু করতে হবে।
সাংবিধানিক শুদ্ধতা এবং আইনের শাসন গণতন্ত্র সংহতকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ। এটা সেই মাত্রায় গুরুত্ববহ যে মাত্রায় নবনির্বাচিত সরকার সাংবিধানিক রীতি ও ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বস্ত থাকে। সে জন্য, অপ্রয়োজনীয় সংশয়, নৈরাজ্য ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে সরকারকে জনগণের জরুরি বিষয়গুলোতে কাজ করা থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর চেষ্টার বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। দেশের মানুষ মাসের পর মাস ভুগেছে। অবশ্যই সহিংসতা, জ্বালানো-পোড়ানো, মৃত্যু, হানাহানি, ব্যক্তিগত ও সরকারি সম্পদের ধ্বংস, জীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি এবং স্কুল-কলেজে পড়ালেখার ব্যাঘাতের ইতি টানতে হবে। হত্যা ও ধ্বংস থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে অবশ্যই নিরাপদ রাখতে হবে, তারা যেন নির্ভয়ে ঘুমাতে পারে এবং নির্বিঘ্নে মন্দিরে প্রার্থনা করতে পারে। বোমা বা ককটেলে দাহ্য না হয়ে শিশুরা যেন নিরাপদে খেলতে পারে। দিনমজুরেরা যেন তাদের পরিবারের ভরণপোষণের উপার্জন ঘরে আনতে পারে। জাতির সামনে এখন এই গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো পড়ে আছে। এ নিয়ে ভ্রান্তি ও সংশয় সৃষ্টি করা উচিত নয়। তার বদলে আসুন, মতপার্থক্য ভুলে একসঙ্গে কাজ করি এবং জনগণের স্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করি।

[ইংরেজি থেকে অনূদিত]
গওহর রিজভী: প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা।

Comments

Popular posts from this blog

‘প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নৈতিক ক্ষমতা আছে’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, একতরফা কোন নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিগত ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় একতরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো নজির নেই। ৮৬ সালের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছিল তাও গ্রহণযোগ্যতা পেত না। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। গতকাল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা নাগরিক হিসাবে উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগের যায়গা থেকেই প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়েছি। আমরা প্রেসিডেন্টের কাছে একই সুরে কথা বলেছি। আমাদের মূল আহ্বান ছিল একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়ে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা আমরা স্পষ্ট করেছি। সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ও সহিংস কর্মসূচিগুলো অবস্থার অবনতি ঘটছে তাও আমরা তুলে ধরেছি। আমরা মনে করি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু সমাধানের আগেই নির্বাচনে সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। এটা আমাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আপনাদেরকে প্রেসিডেন্ট কি আশার বাণী ...

বিএনপিকে নির্মূল করতে মরিয়া সরকার: ফখরুল

বিএনপিকে নির্মূল করতে সরকার মরিয়া বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে ফখরুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মামলায় ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ও জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ গতকাল আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, জনবিচ্ছিন্ন আওয়ামী সরকার বিএনপিসহ দেশের বিরোধী দলগুলোকে নির্মূল করে একদলীয় দু:শাসনকে দীর্ঘায়িত করতেই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ উদ্ভট, মনগড়া ও ভিত্তিহীন মামলা দায়েরের মাধ্যমে তাদেরকে কারাগারে পুরে রাখছে। মূলত: শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপিকে নির্মূল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল  কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বলেই গতকাল তার জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মির্জা ফখরুল অবিলম্বে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ এর বিরু...

অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিন- রাজনীতির নামে নৃশংসতা

যাত্রীসমেত বাসে পেট্রলবোমা মেরে ১৯ জন মানুষকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা যে রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না, এটা কে না জানে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা যেন এ রকমই! এ দেশের মানুষের জীবনযাপন আজ এভাবেই জিম্মি হয়ে পড়েছে নৃশংস রাজনৈতিক কৌশলের হাতে। ১৮-দলীয় জোটের তিন দিনের অবরোধের শেষ দিন গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনাটির নিন্দা এবং ধিক্কার জানানোর ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। নিরীহ ১৯ জন মানুষ, যাঁদের দুজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন, আরও কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। তাঁদের এবং তাঁদের স্বজনদের প্রতি জানাই সান্ত্বনা ও সমবেদনা। পেট্রলবোমার শিকার হওয়া বাসটি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি মডেল। সেটিতে বাসচালক ও তাঁর সহযোগী ছাড়াও ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ—ছাত্র, ব্যাংকের কর্মকর্তা, পুলিশের কনস্টেবল, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। তাঁরা কাজ শেষে ঘরে ফিরছিলেন। কী অপরাধ ছিল তাঁদের? কেন এই নৃশংসতার শিকার তাঁদের হতে হলো? এমন নৃশংসতার ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে সারা দেশের মানুষ। বিরোধী দলের তিন দিনের অবরোধে না...