Skip to main content

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ইতিহাসের বন্দি by সঞ্জয় কুমার

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ইতিহাসের বন্দি। ৫ই জানুয়ারি বাংলাদেশে যে নির্বাচন হলো তা ছিল আওয়ামী লীগের, আওয়ামী লীগের দ্বারা এবং আওয়ামী লীগের জন্য। বাংলাদেশে সমপ্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে এভাবেই বর্ণনা করা যায়।
জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের অর্ধেকেরও বেশি আসনে প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। বাকি অর্ধেকে বন্ধুপ্রতিম দলগুলোর সঙ্গে নামমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। এভাবে জাতীয় সংসদে তিন-চতুর্থাংশ  সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ বিজয় ছিল অপ্রত্যাশিত। এটা এমন একটি সংসদ হলো যেখানে দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিরই কোন প্রতিনিধি নেই। এতে আরও বলা হয়, যে সংসদে প্রধান বিরোধীদলীয় জোট নেই তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই- এটাই স্বাভাবিক। এ প্রশ্নটি যেমন বাংলাদেশের ভিতরে উঠছে তেমনি প্রতিধ্বনি তুলছে বাইরেও। দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটির গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন অনেকেই। এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশে একদলীয় নির্বাচন এটাই প্রথম নয়। ১৯৯০ দশকের মধ্যভাগে ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। তারাও তখন একই রকম নির্বাচন করে বিজয়ী হয়। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তারা সংসদের সবগুলো আসনে বিজয়ী হয়। কিন্তু নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভারে সেই সরকার ভেঙে পড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যে আরেকটি নির্বাচন করে। সেই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফেরে আওয়ামী লীগ। সঞ্জয় কুমার লিখেছেন, বাংলাভাষী এ দেশটিতে যা ঘটছে তার একটি বিশাল ও জটিল ইতিহাস আছে। উদীয়মান এ জাতির কাছে বার বার ফিরে আসছে সেই ইতিহাস। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এটি একটি যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল হলো আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এ দু’টি দলের মধ্যে পিছনের গভীর অবিশ্বাস ও শত্রুতা সৃষ্টি করেছে সেই রাজনৈতিক লড়াই। আলোচনার প্রথম বিষয় হলো: কেন ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণমূলক হয় নি এবং এতে কেন প্রধান রাজনৈতিক দল অংশ নেয় নি? বিএনপি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল এমন একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব করে যেখানে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি থাকবেন। বিরোধী দল এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচনের আগে পদত্যাগ দাবি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা সংবিধান থেকে বাতিল করে আওয়ামী লীগ। ২০১১ সালে এ সংক্রান্ত বিধান সংবিধান থেকে বাতিল করে। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এ রকম সরকারের অধীনেই বাংলাদেশের নির্বাচন হয়েছে। সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করার উদ্যোগে অংশ নেয় নি বিরোধী দল। তারা বুঝতে পেরেছিল এর মাধ্যমে দেশকে কোনদিকে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। তাদের সেই ধারণা সত্য হয়ে বেরিয়ে এসেছে এবারের নির্বাচনে। বাস্তবতা হলো এর আগে সব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আওয়ামী লীগ একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ওই সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল সেনাবাহিনী। ওই সরকার তাৎক্ষণিক নির্বাচন দেয়ার পরিবর্তে তাদের মেয়াদ বাড়াতে চেষ্টা করে এবং চেষ্টা করে বাংলাদেশের প্রথিতযশা দু’টি বড় রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে। শেখ হাসিনা তখন কারাবরণ করেন। বিএনপিও তখন একই পরিণতি ভোগ করে। কিন্তু ওই সময়ের ঘটনা থেকে কোন দলই কোন শিক্ষা নেয় নি। তাদের মধ্যে অনেক বার সংলাপ হয়েছে। তার কোনটিতে সমঝোতা চেষ্টায় ভূমিকা রাখেন আন্তর্জাতিক মহল। কিন্তু পরস্পরবিরোধী দল দু’টির মধ্যে কোন সমঝোতাই হয় নি। কোন চুক্তিতে একমত হয় নি তারা। ফল হিসেবে, আওয়ামী লীগ নির্বাচন করে। বিএনপি ও তার মিত্র, বিশেষ করে ডানপন্থি জামায়াতে ইসলামী সেই নির্বাচনে বাধা দেয়ার চেষ্টা করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ৫ শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান তিন মাসে। শুধু তা-ই নয়। বিরোধীরা হরতাল, অবরোধ আহ্বান করে। অব্যাহত এসব কর্মসূচিতে অচল হয়ে পড়ে পুরো জাতি। বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হচ্ছে যে, জামায়াতে ইসলামীর কট্টরপন্থিরা হিন্দু সমপ্রদায়ের বিরুদ্ধে হামলা করেছে। এই ইতিহাসের কারাগারে বন্দি এখন বাংলাদেশের আধুনিক গণতন্ত্র- এ কথা বলা ভুল হবে না।  তবে যে কেউ প্রশ্ন  করতে পারেন, দেশের বর্তমান অচলাবস্থা কোনদিকে ধাবিত হচ্ছে? সঞ্জয় কুমার লিখেছেন, এই একই প্রশ্ন নির্বাচনের একদিন পরে সংবাদ সম্মেলনে আমি করেছিলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। জবাবে তিনি বলেন, এর পুরোটাই নির্ভর করে বিরোধীদের মনোভাবের ওপর। যদি তারা সংলাপ চায় তাহলে কোন পথ বের করা যেতে পারে।
এক্ষেত্রে একমাত্র পথ হচ্ছে নতুন নির্বাচন এবং এমন নির্বাচন অনিবার্য, তা ছয় মাসে হোক বা এক বছরে। বর্তমানে যে সরকার ক্ষমতায় আছে তারা বৈধতার সমস্যায় ভুগছে। সহিংসতা ও অব্যাহতভাবে স্বাভাবিক জীবনতযাত্রা ব্যাহত হওয়ায় নির্বাচন ও গণতন্ত্র নিয়ে মানুষ হতাশ হয়ে উঠেছে। রাস্তায় আপনি যদি একজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন তাহলে তাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো- তারা চান শান্তি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হোক। কে হারলো এবং কে জিতলো তাতে তাদের কোন তোয়াক্কা নেই। এমন হতাশা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না। এতে শুধু সামরিক হস্তক্ষেপের সুযোগই সৃষ্টি হয়। ১৬ কোটি মানুষের এ দেশটি তা থেকে একেবারে নিরাপদ নয়। গণতন্ত্র হলো জনগণ দ্বারা, জনগণ কর্তৃক ও জনগণের জন্য। কিন্তু এ ধারণাটি তখনই সত্যিকার অর্থে ব্যবহার করা যায় যখন সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ থাকে।
সংক্ষেপে বলতে হয়, ২০১৪ সালের এ নির্বাচনে গণতান্ত্রিক এই চেতনার ঘাটতি রয়েছে।

সঞ্জয় কুমার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক নয়া দিল্লি ভিত্তিক সাংবাদিক। তিনি এশিয়া প্রশান্ত অঞ্চলভিত্তিক ম্যাগাজিন ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-এর একজন প্রতিবেদক।
(২৪শে জানুয়ারি দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ইলেকশনস ২০১৪:  হোয়ার ডেমোক্রেসি ইজ এ প্রিজনার অব হিস্ট্রি’ শীর্ষক লেখার অনুবাদ)

Comments

Popular posts from this blog

‘প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নৈতিক ক্ষমতা আছে’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, একতরফা কোন নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিগত ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় একতরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো নজির নেই। ৮৬ সালের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছিল তাও গ্রহণযোগ্যতা পেত না। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। গতকাল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা নাগরিক হিসাবে উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগের যায়গা থেকেই প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়েছি। আমরা প্রেসিডেন্টের কাছে একই সুরে কথা বলেছি। আমাদের মূল আহ্বান ছিল একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়ে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা আমরা স্পষ্ট করেছি। সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ও সহিংস কর্মসূচিগুলো অবস্থার অবনতি ঘটছে তাও আমরা তুলে ধরেছি। আমরা মনে করি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু সমাধানের আগেই নির্বাচনে সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। এটা আমাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আপনাদেরকে প্রেসিডেন্ট কি আশার বাণী ...

বিএনপিকে নির্মূল করতে মরিয়া সরকার: ফখরুল

বিএনপিকে নির্মূল করতে সরকার মরিয়া বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে ফখরুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মামলায় ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ও জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ গতকাল আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, জনবিচ্ছিন্ন আওয়ামী সরকার বিএনপিসহ দেশের বিরোধী দলগুলোকে নির্মূল করে একদলীয় দু:শাসনকে দীর্ঘায়িত করতেই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ উদ্ভট, মনগড়া ও ভিত্তিহীন মামলা দায়েরের মাধ্যমে তাদেরকে কারাগারে পুরে রাখছে। মূলত: শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপিকে নির্মূল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল  কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বলেই গতকাল তার জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মির্জা ফখরুল অবিলম্বে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ এর বিরু...

অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিন- রাজনীতির নামে নৃশংসতা

যাত্রীসমেত বাসে পেট্রলবোমা মেরে ১৯ জন মানুষকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা যে রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না, এটা কে না জানে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা যেন এ রকমই! এ দেশের মানুষের জীবনযাপন আজ এভাবেই জিম্মি হয়ে পড়েছে নৃশংস রাজনৈতিক কৌশলের হাতে। ১৮-দলীয় জোটের তিন দিনের অবরোধের শেষ দিন গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনাটির নিন্দা এবং ধিক্কার জানানোর ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। নিরীহ ১৯ জন মানুষ, যাঁদের দুজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন, আরও কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। তাঁদের এবং তাঁদের স্বজনদের প্রতি জানাই সান্ত্বনা ও সমবেদনা। পেট্রলবোমার শিকার হওয়া বাসটি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি মডেল। সেটিতে বাসচালক ও তাঁর সহযোগী ছাড়াও ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ—ছাত্র, ব্যাংকের কর্মকর্তা, পুলিশের কনস্টেবল, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। তাঁরা কাজ শেষে ঘরে ফিরছিলেন। কী অপরাধ ছিল তাঁদের? কেন এই নৃশংসতার শিকার তাঁদের হতে হলো? এমন নৃশংসতার ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে সারা দেশের মানুষ। বিরোধী দলের তিন দিনের অবরোধে না...