Skip to main content

মত দ্বিমত- আস্থা কমে যাওয়া অশনিসংকেত by রাশেদা কে চৌধূরী

পিপিআরসি যে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা খুবই প্রয়োজনীয় কাজ। তবে কোনো গবেষণাই পূর্ণাঙ্গ না। কোনো একটি গবেষণা থেকে সব প্রশ্নের উত্তরও আশা করা যায় না। সব গবেষণার কিছু শক্তিশালী দিক থাকে, কিছু সীমাবদ্ধতাও থাকে।
এখানে সেই শক্তির দিক যেমন আছে, তেমনি কিছু দুর্বলতাও নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। এ ধরনের গবেষণাকে জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটা প্রয়াস হিসেবে দেখা যায়। মানুষ কী মনে করে সেই তথ্যগুলো আমাদের জানা দরকার; সেটা জানানো হয়েছে। এটা শুরু, ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই এ ধরনের কাজ আরও হবে।

এই গবেষণা প্রতিবেদনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থার অভাব জোরালোভাবে দেখা গেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি নতুন প্রজন্মের অনীহা জন্মানো একটা অশনিসংকেত। আমাদের কাজের অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্যভাবে জানি যে এতে সত্যের প্রতিফলন ঘটেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি নৈরাজ্য সৃষ্টি করেন বা নৈরাজ্য বন্ধ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে মানুষের আস্থা ধাক্কা খাবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ ধরনের অবস্থা বিরাজ করে অনেকের ধারণা। কিন্তু এ রকম অবস্থা দীর্ঘকাল ধরে চলতে পারে না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব দায়বদ্ধ, গণমুখী ও স্বচ্ছ ভূমিকা পালন করলে যেকোনো কিছু করে পার পেয়ে যাওয়া বা পার করে দেওয়ার সংস্কৃতির অবসান হবে। এর জন্য যে অঙ্গীকার দরকার, তা রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিক থেকেই আসতে হবে। আরেকটা বিপজ্জনক প্রবণতা হলো, দেশের চেয়ে দল বড় হয়ে যাচ্ছে। এই কারণেই তো শতকরা ৭০ ভাগের মতো মানুষের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে দলীয় রাজনীতি প্রবেশ করানো হয়েছে।
বিচারব্যবস্থা নিয়ে বলার ক্ষেত্রে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। যে রীতি ও ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে, তার মধ্য থেকে বেশি কিছু বলা যায় না। কিন্তু এ ব্যাপারে করণীয় নির্ধারণের প্রয়োজন, তা এই গবেষণা থেকে উপলব্ধি করা যায়। র‌্যাবের ব্যাপারে যা বলা হয়েছে, তাকেও পূর্ণাঙ্গ বলা যায় না। অনেক ঘটনার তো খবরই হয় না। মোট ঘটনার শতকরা ২০ ভাগ যেখানে খবর হয়, সেখানে সুশাসন নিশ্চিত করার দরকারে সম্পূর্ণ চিত্রটা জানতে ও জানাতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করায় এটা জরুরি। এই জবাবদিহি জনগণের কাছে, দলের কাছে না। তবে প্রতিবেদনে জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ বিশেষ নেই।
জবাবদিহি নিশ্চিত করায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা থাকা দরকার ছিল। অথচ প্রার্থীদের হলফনামা প্রকাশের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন নিজেই লুকোচুরি খেলছে। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী তথ্য জানার অধিকার আমাদের আছে। ইসি যখন সেই তথ্য দিচ্ছে না বা দিতে চাইছে না, তখন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাজ করার ছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে তথ্য অধিকার কমিশনেরও কোনো ভূমিকা আমরা দেখিনি। এ ব্যাপারে আরও আলোকপাত করা দরকার।
পুলিশের বিষয়ে ক্রমাগতভাবে মানুষের আস্থা কমছে। এটা নতুন না, প্রতিটা দশকে এই আস্থা কমছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে, সরকারের চাপের কারণে দায়িত্ব পালনে বাধা পায়, সেই বিষয়টা গবেষণায় অনুপস্থিত। তাদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্যও তারা যথাযথভাবে কাজ করতে পারে না। এর বাইরে ঢালাওভাবে দলীয় নিয়োগের ব্যাপার তো রয়েছেই। আমরা দেখেছি যে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে তারা দাগি আসামিকেও ছেড়ে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্য ও দলীয়করণ গভীর হয়েছে। এসব বিষয় যখন জনগণের দৃষ্টির মধ্যে আসে, তখন তো তারা আস্থা হারাবেই।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকলাপ যেমন র‌্যাবের বিষয়ে, বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে আরও আলোকপাত করতে হবে। জনগণের
অর্থেই তারা প্রতিপালিত হয়। তাদের দোষ-ত্রুটির কথা যদি আরও আসত তাহলে জনগণও সচেতন হতো এবং র‌্যাব-পুলিশও হয়তো তাদের জবাবদিহির ঘাটতির জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে পারত। এ কারণে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক গবেষণার কথা ভাবা যেতে পারে।
ছাত্ররাজনীতির মধ্যে যে কলঙ্ক আমরা দেখতে পাই, সেটা নিরসনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাণী শুনি, কিন্তু সমাধানের কোনো ভূমিকায় তাঁরা নেই। সন্ত্রাসীদের বহিষ্কার করা হলেও আইনি শাস্তি হতে দেখছি না। বহিষ্কৃত ব্যক্তিরা কিছুদিন পরে আবার দলে ফিরে আসেন। ভবিষ্যতে যে নেতারা আসবেন, তাঁদের চরিত্র তো আমরা ছাত্ররাজনীতির দিকে তাকালেই বুঝতে পারি। এদিকেও আশা করার সুযোগ কম। সব ক্ষেত্রেই এমন হচ্ছে।
সুশীল সমাজের বিভিন্ন অংশ যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপের মধ্যে থাকে, সেটা উঠে না আসা এই গবেষণার আরেকটি সীমাবদ্ধতা। প্রত্যক্ষভাবে তো গণমাধ্যম বন্ধই করে দেওয়া হয়, পরোক্ষভাবে নানা রকম চাপের কারণে মিডিয়া যে জবাবদিহির চাপ তৈরি করবে, সেটাও করতে ব্যর্থ হয়।
এ ধরনের গবেষণা মানুষের ধারণার ওপর ভিত্তি করে করা হয়। তারপরও এই প্রয়াসটা গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের গবেষণা চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

রাশেদা কে চৌধূরী: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা।

Comments

Popular posts from this blog

‘প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নৈতিক ক্ষমতা আছে’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, একতরফা কোন নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিগত ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় একতরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো নজির নেই। ৮৬ সালের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছিল তাও গ্রহণযোগ্যতা পেত না। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। গতকাল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা নাগরিক হিসাবে উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগের যায়গা থেকেই প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়েছি। আমরা প্রেসিডেন্টের কাছে একই সুরে কথা বলেছি। আমাদের মূল আহ্বান ছিল একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়ে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা আমরা স্পষ্ট করেছি। সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ও সহিংস কর্মসূচিগুলো অবস্থার অবনতি ঘটছে তাও আমরা তুলে ধরেছি। আমরা মনে করি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু সমাধানের আগেই নির্বাচনে সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। এটা আমাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আপনাদেরকে প্রেসিডেন্ট কি আশার বাণী ...

বিএনপিকে নির্মূল করতে মরিয়া সরকার: ফখরুল

বিএনপিকে নির্মূল করতে সরকার মরিয়া বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে ফখরুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মামলায় ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ও জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ গতকাল আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, জনবিচ্ছিন্ন আওয়ামী সরকার বিএনপিসহ দেশের বিরোধী দলগুলোকে নির্মূল করে একদলীয় দু:শাসনকে দীর্ঘায়িত করতেই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ উদ্ভট, মনগড়া ও ভিত্তিহীন মামলা দায়েরের মাধ্যমে তাদেরকে কারাগারে পুরে রাখছে। মূলত: শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপিকে নির্মূল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল  কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বলেই গতকাল তার জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মির্জা ফখরুল অবিলম্বে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ এর বিরু...

অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিন- রাজনীতির নামে নৃশংসতা

যাত্রীসমেত বাসে পেট্রলবোমা মেরে ১৯ জন মানুষকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা যে রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না, এটা কে না জানে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা যেন এ রকমই! এ দেশের মানুষের জীবনযাপন আজ এভাবেই জিম্মি হয়ে পড়েছে নৃশংস রাজনৈতিক কৌশলের হাতে। ১৮-দলীয় জোটের তিন দিনের অবরোধের শেষ দিন গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনাটির নিন্দা এবং ধিক্কার জানানোর ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। নিরীহ ১৯ জন মানুষ, যাঁদের দুজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন, আরও কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। তাঁদের এবং তাঁদের স্বজনদের প্রতি জানাই সান্ত্বনা ও সমবেদনা। পেট্রলবোমার শিকার হওয়া বাসটি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি মডেল। সেটিতে বাসচালক ও তাঁর সহযোগী ছাড়াও ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ—ছাত্র, ব্যাংকের কর্মকর্তা, পুলিশের কনস্টেবল, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। তাঁরা কাজ শেষে ঘরে ফিরছিলেন। কী অপরাধ ছিল তাঁদের? কেন এই নৃশংসতার শিকার তাঁদের হতে হলো? এমন নৃশংসতার ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে সারা দেশের মানুষ। বিরোধী দলের তিন দিনের অবরোধে না...