Skip to main content

মৃদুল চৌধুরীর জবানিতে- চোখবাঁধা ৬ দিনের রোমহর্ষক বর্ণনা by মহিউদ্দীন জুয়েল

‘ওদের টার্গেট ছিল আমাকে খুন করা। খুন করার পর লাশ লুকাতে চেয়েছিল। অপহরণের পর তাদের কথাবার্তায় তাই শোনা গেছে। আমি জানতে চেয়েছিলাম আমার অপরাধ কি? তারা শুধু বলেছে, তুই চুপ থাক, মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা কর।’
কথাগুলো বলছিলেন অপহরণের ৬ দিন পর উদ্ধার হওয়া চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মৃদুল চৌধুরী। অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা তাকে বাসার সামনে থেকে অপহরণ করে নিয়ে গেলেও তার বা পরিবারের কাছে কোন মুক্তিপণ দাবি করেনি। বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে। সর্বশেষ গতকাল ভোর রাতে কুমিল্লায় সড়কের পাশে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তাকে ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। তাকে নিয়ে দুর্বৃত্তরা ঘোরাঘুরি করলেও তাদের কাউকেই চিনতে পারেননি মৃদুল। কুমিল্লা থেকে উদ্ধারের পর গতকাল চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে তাকে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মানবজমিনের সঙ্গে কথা বলেন মৃদুল  চৌধুরী। ঘটনার বর্ণনা দেন নিজের জবানিতে। বলেন, ‘আমার দিন কিভাবে কেটেছে তা বলতে পারবো না। আমি বেঁচে আছি। তারা আমাকে বেধড়ক পিটিয়েছে। ছোরা দিয়ে আঘাত করেছে। ওই ঘটনা আর মনে করতে চাই না। দুঃসহ দিন গেছে আমার। যেদিন বাসা থেকে বের হই সেদিন রাস্তার ওপর ওরা ঘাপটি মেরে বসেছিল। ওরা মানে সন্ত্রাসীরা। যাদেরকে কেবল একবার দেখেছি। এরপর আর কিছু মনে নেই। মাইক্রোবাসে মুখোশ পরিয়ে দিলে সব কিছু অন্ধকার হয়ে যায় আমার। যারা আমাকে তুলে নিয়ে গেছে তাদেরকে আমি চিনতে পারিনি। সত্যি চিনি না। কেন অপহরণ করেছে তা-ও জানি না। যে গাড়িতে নিয়ে গেছে তার রঙ ছিলো কালো। বাইরে থেকে কিছুই দেখা যায় না। ঘটনার দিন ৩-৪ জন লোক আমার গতি রোধ করে। এরপর পিস্তল ঠেকিয়ে জোর করে গাড়িতে ওঠায়। বলে না উঠলে গুলি করবে। আমি ভয়ে উঠে পড়ি। মাইক্রোতে তুলেই ওরা মোটা কাপড় দিয়ে মুখ বেঁধে ফেলে। বলে, কথা বললেই গুলি করে রাস্তায় ফেলে দেবো। চিৎকার করিস না। যদি তা করিস তাহলে মরণ ডেকে আনবি। আমি শুধু বলেছি, তোমরা কারা? তারা বলেছে, আমরা কারা বুঝতে পারবি পায়ে গুলি করার পর। আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর সন্ত্রাসীরা কোথায় রাখবে তা নিয়ে ঝামেলায় পড়ে যায়। এই সময় তারা কয়েকজন ফোনে কথা বলতে থাকে। মোবাইলের ওপর প্রান্ত থেকে কেউ একজন তাদেরকে নির্দেশ দেয় দুই দিন চট্টগ্রাম শহরে রাখতে। সেই মোতাবেক ওরা আমাকে বেশ কয়েকটি বাড়িতে নিয়ে যেতে টানাহেঁচড়া করে। প্রথম দিন রাতে দেখলাম আমার হাত-পা বাঁধা। মুখোশ খুলে দিলে দেখি একটি বিশাল বাড়ি। চেয়ারের ওপর বসে আছি। চারপাশে আবছা অন্ধকার। কিছুই দেখছিলাম না। কিছু শুকনো খাবার একটি থালাতে রাখা হয়েছে। আমার পেছন থেকে একজন লোক মাথায় জোরে থাপ্পড় দিয়ে বলে, এগুলো খেয়ে নে। এরপর পিস্তলের বাঁট দিয়ে জোরে আঘাত করা হয় পেছনের দিকে। আমাকে ওরা লোহার রড দিয়ে শুইয়ে খুব পিটিয়েছে। আমি চিৎকার করছিলাম। আকুতি জানাচ্ছিলাম। ওদের একজন আমার হাউমাউ শুনে বললো, মাইরটা ভালই হচ্ছে। আরও পিটা। যেন পঙ্গু হয়ে যায়।’ নির্যাতনের চিত্র দেখাতে গিয়ে এ সময় মৃদুল তার পরনের কাপড়ের খানিক অংশ উপরে উঠিয়ে দুই পা মেলে ধরেন। তিনি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন, ‘এই যে দেখুন লোহার রডের আঘাত। দুই উরুতে ধারালো ছুরি দিয়ে পোঁচ দিয়েছে। আমি মাইরের সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। একদিন জ্ঞান ফেরার পর দেখি তারা বলছে ওকে মেরে ফেলে দেয়ার নির্দেশ আসছে ওপর থেকে। আমি বললাম, ভাই কি জন্য আমাকে ধরেছেন? বাসায় সবাই টেনশনে আছে। আমাকে ছেড়ে দিন। জবাবে তারা বললো, বাসায় গিয়ে কাজ নেই। সোনা বিক্রি করে অনেক টাকা কামিয়েছিস। এইবার দুনিয়া ছেড়ে চলে যা। বলেই আবার মাইক্রোতে ওঠায়।’ কুমিল্লা থেকে উদ্ধার হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সন্ধ্যার সময় ওরা আমাকে গাড়িতে উঠিয়ে নেয়। আবার মুখোশ পরিয়ে দেয়। শব্দ করতে যাতে না পারি সে জন্য মুখে কাপড় গুঁজে দেয়। গাড়ি যখন চলছিল তখন আমার শরীরে কোন শক্তি নেই। আওয়াজ বের হচ্ছিল না। একজন ড্রাইভারকে নির্দেশ দিয়ে বললো গাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম দিয়ে সোজা ঢুকবে।’ রাস্তায় ফেলে দেয়ার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘গভীর রাতের দিকে একজন বলে ওঠে টহল পুলিশ রাস্তায় বেরিয়েছে। যদি গাড়ি তল্লাশি করে তাহলে ধরা পড়ে যেতে পারি। এই কথা শুনে ড্রাইভার বললো, ভাই ওকে গুলি করে ফেলে দেন। ঝটপট এই রাস্তা দিয়ে চলে যাই। আরেকজন বললো, গুলি করলে বেশি দূর যেতে পারবো না। তার চেয়ে বিপদ ডেকে লাভ নেই। মুখে ওষুধ লাগিয়ে দে। তারা আমাকে চোখে মলম লাগিয়ে দেয়। এরপর গামছা দিয়ে বেঁধে গাড়ি থেকে ফেলে দেয়। আমি কিছুই মনে করতে পারি না। ভোররাতের দিকে হুঁশ ফিরে আসে। তখন এক লোক আমাকে বলে, কি হয়েছে? আমি কথা বলতে পারছিলাম না। মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছিল। পরে জানতে পারি ওই ব্যক্তি নৈশপ্রহরী। ’
তিনি বলেন, কেন তারা আমাকে অপহরণ করলো, কি তাদের উদ্দেশ্য ছিল কিছুই বলেনি। কোন ধরনের টাকাও দাবি করেনি। তবে ওদের টার্গেট ছিল আমাকে খুন করা। এই কথা তারা বারবারই বলেছে।’ 
মৃদুল চৌধুরী অপহরণ হওয়ার পর তাকে কুমিল্লা থেকে নিয়ে এসে বিকাল ৫টায় নগরীর বেসরকারি হাসপাতাল রয়েলে ভর্তি করানো হয়। এই সময় তার পরিবারের লোকজনকে বিমর্ষ দেখা যায়। কথা বলতে চাইলে ছোট ভাই শিমুল চৌধুরী বলেন, আমরা আতংকে আছি। সন্ত্রাসীরা মৃদুলের কোন বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারেনি। তারা আবার আসবে। এইবার হয়তো বড় ধরনের কোন ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের জীবনের নিরাপত্তা দেবে কে? চট্টগ্রাম নগর পুলিশ জানায়, গত ১১ই ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের বাসা থেকে অপহরণ হন মৃদুল চৌধুরী। বাসা থেকে বের হলে র‌্যাব পরিচয়ে একটি দল তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এরপর আর কোন খোঁজ মেলেনি এই ব্যবসায়ীর। ঘটনার পরপরই অপহৃতের ছোট ভাই অজ্ঞাত কয়েক জনকে আসামি করে  কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, র‌্যাবের সঙ্গে পূর্বশত্রুতার জের ধরেই মৃদুল চৌধুরীকে অপহরণ করা হয়েছে। মৃদুল নগরীর নিউ মার্কেটের দুলহান জুয়েলার্স নামের একটি স্বর্ণের  দোকানের মালিক। গত বছরের অক্টোবরে র‌্যাবের বিরুদ্ধে একটি প্রতারণা মামলা করেছিলেন। আর ওই ঘটনার জের ধরেই তাকে অপহরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের। অপহৃতের ভাই শিমুল চৌধুরী এই বিষয়ে বলেন, আমাদের বাড়ি হাটহাজারীর মিরেরখিল এলাকায়। কিছুদিন আগে ভাই মৃদুল ঢাকার সিএমএম কোর্টে ৮০ ভরি স্বর্ণ লুটের ঘটনায় র‌্যাব ২-এর মেজর রাকিবুল আমিনসহ তিনজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছিলেন। বাকি দুই অভিযুক্ত হচ্ছেন র‌্যাবের সোর্স ফাহাদ চৌধুরী টিপু ও গাড়িচালক বাবুল পাল। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কথা হয় নগরীর কোতোয়ালি থানার ওসি একেএম মহিউদ্দিন  সেলিমের সঙ্গে। তিনি মামলা দায়েরের বিষয়টি সত্যি বলে জানান। এই বিষয়ে বলেন, প্রথম দিকে একটি জিডি করা হয়েছিল। পরে তা মামলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি অপরাধীদের শনাক্ত করতে।

Comments

Popular posts from this blog

‘প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নৈতিক ক্ষমতা আছে’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, একতরফা কোন নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিগত ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় একতরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো নজির নেই। ৮৬ সালের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছিল তাও গ্রহণযোগ্যতা পেত না। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। গতকাল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা নাগরিক হিসাবে উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগের যায়গা থেকেই প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়েছি। আমরা প্রেসিডেন্টের কাছে একই সুরে কথা বলেছি। আমাদের মূল আহ্বান ছিল একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়ে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা আমরা স্পষ্ট করেছি। সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ও সহিংস কর্মসূচিগুলো অবস্থার অবনতি ঘটছে তাও আমরা তুলে ধরেছি। আমরা মনে করি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু সমাধানের আগেই নির্বাচনে সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। এটা আমাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আপনাদেরকে প্রেসিডেন্ট কি আশার বাণী ...

বিএনপিকে নির্মূল করতে মরিয়া সরকার: ফখরুল

বিএনপিকে নির্মূল করতে সরকার মরিয়া বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে ফখরুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মামলায় ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ও জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ গতকাল আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, জনবিচ্ছিন্ন আওয়ামী সরকার বিএনপিসহ দেশের বিরোধী দলগুলোকে নির্মূল করে একদলীয় দু:শাসনকে দীর্ঘায়িত করতেই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ উদ্ভট, মনগড়া ও ভিত্তিহীন মামলা দায়েরের মাধ্যমে তাদেরকে কারাগারে পুরে রাখছে। মূলত: শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপিকে নির্মূল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল  কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বলেই গতকাল তার জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মির্জা ফখরুল অবিলম্বে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ এর বিরু...

অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিন- রাজনীতির নামে নৃশংসতা

যাত্রীসমেত বাসে পেট্রলবোমা মেরে ১৯ জন মানুষকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা যে রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না, এটা কে না জানে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা যেন এ রকমই! এ দেশের মানুষের জীবনযাপন আজ এভাবেই জিম্মি হয়ে পড়েছে নৃশংস রাজনৈতিক কৌশলের হাতে। ১৮-দলীয় জোটের তিন দিনের অবরোধের শেষ দিন গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনাটির নিন্দা এবং ধিক্কার জানানোর ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। নিরীহ ১৯ জন মানুষ, যাঁদের দুজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন, আরও কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। তাঁদের এবং তাঁদের স্বজনদের প্রতি জানাই সান্ত্বনা ও সমবেদনা। পেট্রলবোমার শিকার হওয়া বাসটি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি মডেল। সেটিতে বাসচালক ও তাঁর সহযোগী ছাড়াও ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ—ছাত্র, ব্যাংকের কর্মকর্তা, পুলিশের কনস্টেবল, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। তাঁরা কাজ শেষে ঘরে ফিরছিলেন। কী অপরাধ ছিল তাঁদের? কেন এই নৃশংসতার শিকার তাঁদের হতে হলো? এমন নৃশংসতার ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে সারা দেশের মানুষ। বিরোধী দলের তিন দিনের অবরোধে না...